চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে জমি দখল ও জাল কাগজপত্র: শারমিন আক্তারের বিরুদ্ধে মামলার অন্তর্নিহিত সংঘাত

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন পাঁচলাইশ মৌজায় দীর্ঘদিন ধরে একটি আবাসিক জমি নিয়ে বিরোধ, দখল, জাল কাগজপত্র তৈরির চেষ্টা এবং হুমকিসহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, জমিটি নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার এবং পার্শ্ববর্তী প্রভাবশালী ব্যক্তি শারমিন আক্তার ও তার পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। জমির মালিক মোহাম্মদ মাহফুজুল হক দীর্ঘদিন ধরে সেখানে টিনের ঘর নির্মাণ করে পাকা বাউন্ডারি দিয়ে বসবাস করছিলেন। বর্তমানে তিনি কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা আবুল হাশেম লেদু, তার ছেলে ইসমাইল ও মেয়ে শারমিন আক্তার বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে জমিটি নিজেদের দাবি করতে শুরু করেন। প্রথমে তারা জমিটি দেখাশোনার সুযোগ নিয়েছিলেন এবং পরে সেখানে বিভিন্ন মালামাল রাখে। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেছেন, জমিতে নির্মাণ কাজ করতে গেলে অভিযুক্তরা নিয়মিত বাধা দেয় এবং প্রাণনাশের হুমকিসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর এবং ২০২৪ সালের ১৮ মে ভুক্তভোগী পরিবার বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি করেন। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা জমির বাউন্ডারির ওপর টিনের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা করে এবং বাধা দিলে গালিগালাজ ও হুমকি প্রদান করে।

পরবর্তীতে চট্টগ্রামের বিজ্ঞ অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার প্রাথমিক শুনানিতে জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, আদালতের নির্দেশ অমান্য করে অভিযুক্তরা পুনরায় জমিতে নির্মাণকাজ করার চেষ্টা চালান। মরিয়ম বেগম নামের এক নারী বাদী হয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রতারণার মাধ্যমে জাল কাগজপত্র তৈরি করে জমি আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭০, ৪৭১, ৫০৬ ও ৩৪ ধারাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মাহিবুল হক সাংবাদিকদের জানান, “আমাদের জমি দখলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি এবং আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি। আদালতের নির্দেশ অমান্য করা হলে আমরা আরও কড়া আইনি পদক্ষেপ নেবো।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন, শারমিন আক্তারের পরিবার নিয়মিত আসামি পক্ষের কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করছে। “এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আশা করি প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে,” বলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে দলিল ও কাগজপত্রের যথাযথতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনগতভাবে প্রমাণ থাকলে আদালতের মাধ্যমে দ্রুত সমাধান পাওয়া সম্ভব। “কোনো পক্ষ যদি জোরপূর্বক দখল বা চাঁদাবাজির চেষ্টা করে, তা দণ্ডনীয় অপরাধ। ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতে পারেন এবং প্রশাসন বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবস্থা নেবে,বলেন স্থানীয় একজন প্রখ্যাত আইনজীবী।

পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার পর তদন্ত শুরু করা হয়েছে। পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেছেন, “আমরা তদন্তে সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। জমির দলিলপত্র যাচাই করা হচ্ছে, সাক্ষী সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হবে।

ভুক্তভোগী পরিবারের মতে, তারা দীর্ঘদিন ধরে জমির বৈধ মালিক এবং ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন পেয়েছেন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বৈধ অনুমোদনের পর তারা জমিতে সাত ইউনিট বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ করতে চাচ্ছিলেন। তবে অভিযুক্তরা ধারাবাহিকভাবে নির্মাণকাজে বাধা দিচ্ছেন এবং ১০ লাখ টাকার চাঁদা দাবি করেছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা ছোটবেলা থেকে ওই জমিটিকে মাহফুজুল হকের পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে দেখেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিরোধ তৈরি হয়েছে। এলাকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আফজল হোসেন বলেন,এই ধরনের জমি বিরোধ ন্যায়বিচারের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে। প্রশাসন ও আদালতের কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

ভুক্তভোগী মরিয়ম বেগম বলেন,আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমাদের সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখতে আইনের সাহায্য চাই। আমরা চাই না কারো সঙ্গে দ্বন্দ্ব। আমাদের শুধু নিজের জমি ব্যবহার করার অধিকার রয়েছে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেন। এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা কোনো হুমকি বা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত নই। বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।

মামলার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা জাল সনদ তৈরি করে তা সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তদন্তে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রমাণ মেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সমাধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হবে এবং আইনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা আশা করছেন, দ্রুত তদন্ত ও আদালতের রায় প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের বিরোধ সমাধান হবে। এলাকার সাধারণ মানুষও স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসতে পারবে।

বর্তমানে এলাকায় সতর্ক অবস্থা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে চাইছে। তারা মনে করেন, আদালতের রায় ও প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান সম্ভব নয়।

স্থানীয়রা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধ এড়াতে জমির রেকর্ড ও মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আরও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। আইনজীবীরা বলেন, “জমি সংক্রান্ত মামলা দীর্ঘস্থায়ী হলেও সঠিক দলিল ও প্রমাণ থাকলে আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব।

চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন এই জমি বিরোধ শুধু একটি পরিবার বা কয়েকজন ব্যক্তির সমস্যা নয়, এটি দেশের নগর এলাকায় জমি দখল ও জাল কাগজ ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি উদাহরণ। সুষ্ঠু তদন্ত ও আদালতের কার্যকর রায়ের মাধ্যমে এই ধরনের বিরোধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button