গাইবান্ধার এক সফল নারী উদ্যোক্তার গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ শেফালী বেগমের বয়স যখন সাত মাস, তখন তাঁর মা-বাবার মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরে সৎমায়ের সংসারে শেফালী বড় হতে থাকেন। সৎমা আট সন্তানের মা হন। তখন তিনি অবহেলার মধ্যে পড়েন। ১৩ বছর বয়সে চাকরিজীবী ছেলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিন ছেলে-মেয়ের মা হন শেফালী।
শেফালীর পাঁচ সদস্যের সংসার ভালোই চলছিল। ২০০৯ সালে স্বামী অবসরে যান। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির আয় বন্ধ হওয়ায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। তখন তিনি কাঁথা সেলাইয়ের কাজ বেছে নেন। বাড়িতে কাঁথা সেলাই করে শহরে বিক্রি করতেন। প্রতি মাসে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হতো। এই টাকা দিয়ে সংসারের হাল ধরেন। এভাবেই ঝুঁকে ঝুঁকে আট বছর কেটে যায়। এ সময় তাঁর অধীন ২৫ জন নারী কাজ করতেন।
২০১৮ সালে তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) পলাশবাড়ী কার্যালয় থেকে সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় সেলাই প্রশিক্ষণ নেন। দুই মাসের প্রশিক্ষণ শেষে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথমে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এরপর বড় পরিসরে
যাত্রা শুরু তাঁর। বর্তমানে তাঁর অধীন দুই শতাধিক নারী কাজ করছেন। খরচ বাদে তাঁর মাসিক আয় হচ্ছে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। তিনি পাঁচ শতক বসতভিটায় পাকা বাড়ি করেছেন। বেশ কিছু জমিও কিনেছেন। নকশিকাঁথার কাজ তাঁর ভাগ্য বদলে দিয়েছে। তিনি এখন সফল নারী উদ্যোক্তা।
প্রকারভেদে একটি নকশিকাঁথা তৈরি করতে মজুরিসহ খরচ হয় দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিটির দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ হাত ও প্রস্থ সাড়ে চার হাত। একটি কাঁথা তৈরি করতে একজন নারীর ১৫ দিন সময় লাগে। নকশা করা প্রতিটি কাঁথা আড়াই হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা ও রংপুরে এসব নকশিকাঁথা বিক্রি হয়।
শেফালীর অধীন কাজ করে পলাশবাড়ীর ২৫০ জন দরিদ্র নারী এখন স্বাবলম্বী। প্রত্যেক নারী মাসে চার হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। গৃধারীপুর গ্রামের নারী বিউটি খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী আল আমিন উপজেলা শহরে চায়ের দোকান চালান। দোকানের আয়ে ছয়জনের সংসার চলে না। ২০২০ সাল থেকে এখানে কাজ করছি। প্রতি মাসে গড়ে ছয় হাজার টাকা আয় হচ্ছে।’
একই এলাকার পিংকি রানী (৪৫) এর স্বামী বাসশ্রমিক। স্বামীর আয় দিয়ে চার সদস্যের সংসার ঠিকঠাকভাবে চলছিল না। পিংকি রানী বলেন, ‘চার
হেবছর ধরে শেফালী আপার অধীন কাজ করছি। প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় করছি। এই টাকা দিয়ে সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের জোগান দিচ্ছি।’
গত বছর ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী’ ক্যাটাগরিতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার পেয়েছেন শেফালী বেগম। তাঁর বাবার বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌর শহরের ছোট আমবাড়ী এলাকায়। তাঁর বাবা দেলোয়ার হোসেন ২০০০ সালে মারা যান। মা খুশি বেগম বেঁচে আছেন।
শেফালী তাঁর বাবার বাড়ি পলাশবাড়ীর শ্যামপুর দোকানঘর এলাকায় থাকেন। ১৯৯০ সালে একই উপজেলার শহরের উদয়সাগর মুন্সিপাড়া এলাকার রেজাউল আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এখন রেজাউল আলম কর্মহীন। তাঁদের বড় মেয়ে আশা মনির বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ রংপুর পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে পাস করে চাঁদপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ছোট ছেলে তৌফিক নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
উদয়সাগর গ্রামের রিয়া মনি (২২) এর স্বামী মিজানুর রহমান মাছের ব্যবসা করেন। রিয়া মণি বলেন, স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। কাঁথা সেলাই করে মাসে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা বাড়তি আয় করছেন। এখন সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে।
একই গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী মিতু খাতুন জানায়, মা-বাবা ঠিকমতো লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারেন না। তাই পড়াশোনার অবসর সময়ে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছে সে। প্রতি মাসে গড়ে চার হাজার টাকা আয় হচ্ছে। তা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছে। মাঝেমধ্যে সংসারেও দিচ্ছে।



