চট্টগ্রামের ভয়ংকর সন্ত্রাসী মাদক কারবারি যুবলীগের নেতা অতিরিক্ত মাদক সেবনে মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার আমবাগান আনসার ক্লাব এলাকায় পুলিশের অভিযানের সময় অতিরিক্ত ইয়াবা সেবনের ঘটনায় অসুস্থ হয়ে পড়া সাবেক যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম প্রকাশ টেডির মৃত্যু ঘিরে পুরো নগরজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।দীর্ঘদিন ধরে হত্যা,সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসার অভিযোগে আলোচিত এই ব্যক্তির মৃত্যু নতুন করে চট্টগ্রাম নগরীর অপরাধ জগতের অন্ধকার ইতিহাসকে সামনে এনে দিয়েছে।স্থানীয়দের মতে দিদারুল আলমের জীবন ছিল অপরাধ,মাদক ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত একটি দীর্ঘ বিতর্কিত অধ্যায়।
রবিবার ৮ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রা পত্রিকার অনলাইন ভিডিও ভার্সনের পেইজে প্রায় ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও মুহূর্তেই চট্টগ্রাম শহর সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ভিডিওতে দেখা যায় দিদার মাদক সেবন অবস্থায় জামাবিহীন মাটিতে গড়াগড়ি করছেন এবং অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। কখনও তিনি মাটি চাপড়াচ্ছেন আবার কখনও অসংলগ্নভাবে কথা বলছেন।সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রার ভিডিও ভার্সনে ভিডিওটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহলে আলোচনার ঝড় ওঠে।পরে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় ভিডিওতে দেখা ওই যুবকই চট্টগ্রামের আলোচিত টপ টেটর ব্যক্তি সাবেক যুবলীগের নেতা দিদারুল আলম প্রকাশ টেডি।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ৬ মার্চ গভীর রাতে নগর পুলিশের বিশেষ অভিযান এস ড্রাইভের অংশ হিসেবে খুলশী থানার আমবাগান আনসার ক্লাব এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।নগরজুড়ে চলমান এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা।
পুলিশের কাছে আগে থেকেই তথ্য ছিল যে বহু মামলার আসামি দিদারুল আলম ওই এলাকায় অবস্থান করছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে অভিযান শুরু করেন।অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে দিদারুল দ্রুত পালানোর চেষ্টা করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী গ্রেপ্তার এড়ানোর উদ্দেশ্যে নিজের কাছে থাকা ইয়াবা ট্যাবলেট দ্রুত চিবিয়ে খেয়ে ফেলেন তিনি। অতিরিক্ত ইয়াবা সেবনের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তার শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মাটিতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন এবং তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়।
এ সময় স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন।পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত ইয়াবা চিবিয়ে খাওয়ার কারণেই দিদারুল আলমের মৃত্যু হয়েছে।তার মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।এ ঘটনায় খুলশী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
পুলিশের নথি অনুযায়ী দিদারুল আলম প্রকাশ টেডির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে।এসব মামলার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন।
মামলার নথি অনুযায়ী সিএমপি ডবলমুরিং মডেল থানার এফআইআর নম্বর ৭ তারিখ ৮ মে ২০২২ জি আর নম্বর ১৬৭ ২০২২ তারিখ ৯ মে ২০২২ অনুযায়ী বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ ৩৪ ধারায় তাকে একটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়।পরে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে এই মামলায় সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয় এবং তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়।দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
এর আগে সিএমপি ডবলমুরিং মডেল থানার এফআইআর নম্বর ১২ তারিখ ৮ জানুয়ারি ২০১৯ জি আর নম্বর ১২ ২০১৯ মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩ ১৪৭ ১৪৮ ৩২৩ ৩০৭ ৩২৬ ৩০২ ৩৮০ ৪২৭ ৪৩৬ ৫০৬(২) ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।এই মামলায় অবৈধ সমাবেশ,দাঙ্গা, গুরুতর আঘাত,হত্যাচেষ্টা, হত্যা, চুরি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো গুরুতর অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।এসব অপরাধের শাস্তি বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
এছাড়া ডবলমুরিং মডেল থানার এফআইআর নম্বর ৩৩ তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ জি আর নম্বর ৬২ ২০১৭ মামলায় তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩ ৩৪১ ৩৮৫ ৩০৭ ৩২৩ ৩২৪ ৩৭৯ ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় অবৈধ সমাবেশ, পথরোধ, চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা, আঘাত, অস্ত্র দিয়ে আঘাত, চুরি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে।
আরও একটি পুরোনো মামলা রয়েছে ডবলমুরিং মডেল থানার এফআইআর নম্বর ২৭ তারিখ ২৭ আগস্ট ২০১৫। এই মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ৩৪ ধারায় তাকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
পুলিশ সূত্র জানায় এসব মামলার কারণে দিদারুল আলমের জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে জেল হাজতে।কখনও গ্রেপ্তার হয়ে আবার কখনও জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি বারবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেন।
এলাকাবাসীর তথ্য মতে দিদারুল আলম দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য তিনি বিভিন্ন সময় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন দিদার একজন নিয়মিত মাদকসেবী ছিলেন।পাশাপাশি তিনি মাদক ব্যবসা,দখলবাজি এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।তার কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ভয়ের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী অতীতে আওয়ামী যুবলীগের রাজনৈতিক প্রভাবের সময়েও তিনি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। ফলে বহুবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটান।
পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন বহুবার তাকে আইনের আওতায় এনে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময় তাকে সতর্ক করা হয়েছিল যেন তিনি অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে দিদারুল আলমের জীবন কাহিনি একটি বড় শিক্ষা।অপরাধ জগত মানুষের জীবনে সাময়িক ক্ষমতা বা প্রভাব এনে দিতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যায়।
চট্টগ্রাম নগরীর সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল মাদক ও সন্ত্রাসের পথ শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন এটি সমাজের তরুণদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
তাদের মতে মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।পরিবার,সমাজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন দিদারুল আলমের জীবন ও মৃত্যু থেকে সমাজের মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে।অপরাধের পথ যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন তার শেষ পরিণতি হয় ধ্বংস।
চট্টগ্রাম নগরীর এই ঘটনা তাই কেবল একটি মৃত্যুর খবর নয় বরং একটি সামাজিক বার্তা।যারা এখনও মাদক ব্যবসা বা সন্ত্রাসের পথে জড়িয়ে পড়ছে তাদের জন্য এটি একটি কঠিন বাস্তবতার উদাহরণ।সময় থাকতে সঠিক পথে ফিরে আসাই একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।



