আধুনিক নীলচাষের কবলে দেশ, ফুরিয়ে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি ও কৃষকের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
“আগামীর যুদ্ধ হবে সুপেয় পানির যুদ্ধ”—কয়েক যুগ আগের এই সতর্কবাণী আজ যেন বাস্তবের দোরগোড়ায়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াটার ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলার ঘটনা এবং পাল্টা হুমকির জেরে বিশ্বব্যাপী সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ পানির উৎসরক্ষায় মরিয়া, তখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির ভান্ডার—‘বেঙ্গল বেসিন’-এর অধিকারী বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে।
দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার নামে তৈরি পোশাক শিল্পের (গার্মেন্টস) মাধ্যমে এই মহামূল্যবান সম্পদ অবাধে অপচয় করা হচ্ছে। পরিবেশবিদ ও সচেতন মহল এই ব্যবস্থাকে আখ্যা দিচ্ছেন ‘আধুনিক নীলচাষ’ হিসেবে।
কৃষকের সন্তানের হাতে লাঙলের বদলে সেলাই মেশিন ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ আমলে বাংলার কৃষকদের জোর করে নীলচাষ করানো হতো। জমির মালিকানা কৃষকের হলেও ফসলের মালিক ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি। দুই শতাব্দী পর দৃশ্যপট পাল্টেছে—নীলের জায়গায় এসেছে রেডিমেড গার্মেন্টস। কৃষি জমি পড়ে থাকছে, আর ‘ধান-নদী-খালের’ দেশের তরুণরা আজ কারখানায় ‘কাটিং-লাইন-ফিনিশিং’ বিভাগের কর্মচারী।
দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে গার্মেন্টস শিল্পে জড়িত, যা মোট রপ্তানির ৮০-৮৫ শতাংশ জোগান দেয়। কিন্তু কাগজে-কলমে এই উন্নয়নের আড়ালে রয়েছে শোষণের এক নির্মম গল্প। উৎপাদিত পোশাকের বিপুল মুনাফার প্রায় ৭০ শতাংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি ক্রেতা ও দালালদের পকেটে। অন্যদিকে, জিএসপি সুবিধার মতো সামান্য প্রাপ্তির আশায় দেশের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক মহল—বিশেষ করে ড. ইউনূস এবং তাকে সমর্থনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা—এই শোষণকে আরও দীর্ঘায়িত করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকরা।
বছরে ১৫০০ বিলিয়ন লিটার পানির অপচয় এই শিল্পের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো এর পরিবেশগত প্রভাব। ডাইং ও ওয়াশিং প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১ কেজি ডেনিম কাপড় প্রক্রিয়াজাত করতে ১৫০ থেকে ২৫০ লিটার পর্যন্ত পানি প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে গার্মেন্টস শিল্প বছরে প্রায় ১৫০০ বিলিয়ন লিটার ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছে, যা ঢাকার কোটি মানুষের মাসের পর মাসের পানির চাহিদার সমান। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।
দূষিত নদী ও ক্যান্সারের বিস্তার ব্যঙ্গের বিষয় হলো, যে পানি দিয়ে বিদেশিদের ফ্যাশনের জন্য জিন্স ধোয়া হয়, সেই পানিই বিষাক্ত রং ও রাসায়নিক মিশে বিনা পরিশোধনে ফিরে আসছে দেশের নদী-নালায়। ঢাকার আশেপাশের শিল্প এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে।
একসময় যে নদী কৃষকের জমিতে সেচ দিত, তা আজ রঙিন বিষের আধার। এই দূষণের কারণে নদী-খাল থেকে দেশি মাছ প্রায় বিলুপ্ত। বাধ্য হয়ে মানুষকে খেতে হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিকে বড় হওয়া চাষের মাছ। আর পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত এই দূষণের সরাসরি ফলস্বরূপ দেশজুড়ে ঘরে ঘরে বাড়ছে ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি।
উন্নয়নের অদ্ভুত নাটক ব্রিটিশ আমলে ইউরোপে যেত বাংলার নীল, আর আজ যায় জিন্স আর টি-শার্ট। তখন নষ্ট হতো কৃষকের উর্বর জমি, আর আজ ধ্বংস হচ্ছে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি ও নদী। দুই যুগের ব্যবধানে শোষণের গল্পটি বদলায়নি; একদিকে বিদেশি বাজারের চাহিদা, আর অন্যদিকে বাংলার মাটি ও মানুষের নীরব আত্মত্যাগ। এই তথাকথিত উন্নয়নের খেসারত জাতিকে কতদিন দিতে হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



