অভিযানআইন-শৃঙ্খলারাজনীতি

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর বড় অভিযান,২২ জন আটক বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার

মুহাম্মদ জুবাইর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী,র‌্যাব,পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে বৃহৎ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।অভিযানে ২২ জনকে আটক করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র,গোলাবারুদ ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাব সূত্রে জানা যায়,গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালানোর সময় দুষ্কৃতিকারীরা র‌্যাব সদস্যদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।এতে চারজন র‌্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন।পরে তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম সিএমএইচে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক একজন র‌্যাব সদস্যকে মৃত ঘোষণা করেন।ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারাদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে,জঙ্গল সলিমপুর দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।গত চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি।পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও দখল বজায় রাখতে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা হয় এবং সার্বক্ষণিক পাহারা বসানো হয়।

এই পরিস্থিতিতে গত ৯ মার্চ ভোর সাড়ে ৫টা থেকে সেনাবাহিনী,পুলিশ,র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে বড় ধরনের বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।অভিযানে সাতজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৩ হাজার ১৮৩ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন,যার মধ্যে র‌্যাবের প্রায় ৪০০ সদস্য ছিল।

অভিযান শুরুর আগে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ ও বাহিরের পথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয় এবং পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী।পরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে ২২ জনকে আটক করা হয়।

অভিযানকালে যৌথবাহিনী তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র একটি বিদেশি পিস্তল,একটি দেশীয় পিস্তল ও একটি এলজি উদ্ধার করে।এছাড়া ২৭টি পাইপগান,৩০টি পিস্তলের ম্যাগাজিন,৫৭টি অস্ত্র তৈরির পাইপ,৬১টি কার্তুজ এবং বিভিন্ন ধরনের এক হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।পাশাপাশি ১১টি ককটেল,পাইপগান তৈরির লেদ মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

অভিযানে অপরাধীদের নজরদারির কাজে ব্যবহৃত ১৯টি সিসি ক্যামেরা,তিনটি ডিডিআর,একটি পাওয়ার বক্স এবং দুটি বাইনোকুলারও উদ্ধার করা হয়েছে।

যৌথবাহিনীর সদস্যরা আলীনগর এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে অবস্থিত সন্ত্রাসীদের আস্তানা ও অস্ত্র তৈরির কারখানাসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেন।একই সঙ্গে পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ওয়াচ টাওয়ারগুলোর কার্যক্রমও ভেঙে দেওয়া হয়।এসব ওয়াচ টাওয়ার ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত।

অভিযান শেষে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি অস্থায়ী পুলিশ ও র‌্যাব ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়,এই অভিযানের ফলে এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ,অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার,অপরাধীদের নেটওয়ার্ক দুর্বল করা এবং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছে।পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দারা স্বস্তি প্রকাশ করে যৌথবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে,জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অপরাধ দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় অভিযান ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এলাকাবাসীর তথ্য মতে যারা অত্র এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রশাসনের অভিযানের কথা টের পেয়ে তার আগেই পালিয়ে যান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button