অন্যান্য

ত্রিশ কোটি টাকার ঋণের প্রলোভন,নারী উদ্যোক্তার ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাব এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন এক নারী উদ্যোক্তা। রোববার পনেরো মার্চ দুই হাজার ছাব্বিশ তারিখে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী নারী উদ্যোক্তা মিতু আক্তার বলেন, ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় ছয় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রতিশ্রুত ঋণ না দিয়ে উল্টো টাকাগুলো আত্মসাৎ করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে মিতু আক্তার বলেন, গণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উনিশশো তিরানব্বই সাল থেকে দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই সংস্থাটি দেশের বিভিন্ন জেলায় ক্ষুদ্রঋণ ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ঢাকা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় এই সংস্থার কার্যক্রম রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু বাস্তবে উন্নয়নের কথা বললেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মিতু আক্তার বলেন, তিনি একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে একটি অটো রাইস মিল স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। তার এই প্রকল্পের কথা জানার পর সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাকে ত্রিশ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা গ্রহণ করা হয়। দুই হাজার বাইশ সালের একুশ অক্টোবর থেকে দুই হাজার চব্বিশ সালের ছয় নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ব্যাংক লেনদেন ও নগদের মাধ্যমে তার কাছ থেকে মোট ছয় কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। এই সমস্ত অর্থ লেনদেনের প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, প্রতিবার টাকা নেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে আশ্বাস দিয়েছেন যে খুব দ্রুতই ত্রিশ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেওয়া হবে এবং তার প্রকল্প বাস্তবায়নে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও তাকে কোনো ঋণ দেওয়া হয়নি। বরং তিনি যখনই বিষয়টি জানতে চেয়েছেন তখনই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তাকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এতে তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন যে পরিকল্পিতভাবে তার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে।

মিতু আক্তার আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি ঢাকায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। তিনি লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন এবং বারবার ন্যায়বিচার চেয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে তিনি চরম হতাশা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল মামুন মোল্লা, আবুল বাসার, মানিক মোল্লা, আরিফ হোসেন শেখ, জাকির হোসেন বাবুল, মাসুদ শেখ, রইছ খন্দকার ওরফে রাইহান ইসলাম, হেলাল কাজী, রইছ সিকদার, শফিকুল ইসলাম বাবুল, বি এম নুরুজ্জামান এবং কাজিজ ফাতেমা। তার অভিযোগ, এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা সংগ্রহ করেছেন এবং এখন সেই টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সব সঞ্চয়, সম্পদ এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করা অর্থ এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন যদি তিনি ন্যায়বিচার না পান তাহলে তার জীবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই অর্থ ফেরত না পেলে তার সামনে বেঁচে থাকার কোনো পথ থাকবে না।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং যারা প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দেশের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান যেন দ্রুত এই ঘটনার তদন্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়।

এদিকে এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী পক্ষ আইনের আশ্রয় নিয়েছে। জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানায় এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করে প্রতিশ্রুত ঋণ না দিয়ে তা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতরা বলেন, যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে এটি অত্যন্ত গুরুতর প্রতারণার ঘটনা। একজন নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নেওয়ার মতো ঘটনা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ভুক্তভোগী মিতু আক্তার বলেন, তিনি ন্যায়বিচার চান। তার কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত চান। তিনি আশা করেন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো এই ঘটনায় দ্রুত হস্তক্ষেপ করবে এবং তার মতো একজন নারী উদ্যোক্তাকে ন্যায়বিচার পেতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা কেউ যেন প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button