জরিমানার সিলগালার পরও থামেনি শাহীনের ‘ভেজাল ঘি সাম্রাজ্য’মরণ ফাঁদে জনস্বাস্থ্য

মুহাম্মদ জুবাইর
প্রশাসনের অভিযান, মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং কারখানা সিলগালা কোনো কিছুই থামাতে পারেনি চট্টগ্রামে ভেজাল ঘি উৎপাদনকারী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে। অভিযোগ উঠেছে, নানা মহলকে ম্যানেজ করা এবং অদৃশ্য প্রভাব খাটিয়ে স্থান পরিবর্তন করে আবারও পূর্ণোদ্যমে ভেজাল ঘি উৎপাদন ও বাজারজাত করছে শাহিন নামের এক ব্যবসায়ীর নেতৃত্বাধীন চক্র। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের গোপন উৎপাদন কেন্দ্র এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ভেজাল ঘি উৎপাদনের পরিমাণও কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২ ডিসেম্বর ২০২৪ চট্টগ্রামের পশ্চিম মোহরা ধুপপোল এলাকায় জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত একটি অভিযানে ভেজাল ঘি তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। সে সময় চান্দগাঁও সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইউছুফ হাসান এর নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানে একটি টিনশেড ভবনের চারটি কক্ষে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল ঘি উৎপাদনের কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। সেখানে খোলা বাজার থেকে সংগ্রহ করা পাম অয়েলের সঙ্গে সামান্য পরিমাণ আসল ঘি মিশিয়ে বিভিন্ন নামসর্বস্ব কোম্পানির লেবেল ব্যবহার করে পণ্য তৈরি করা হচ্ছিল।
অভিযানকারী কর্মকর্তারা দেখতে পান, প্রতি ৪ থেকে ৫ কেজি পাম অয়েলের সঙ্গে মাত্র ১ কেজি আসল ঘি মিশিয়ে তা কৃত্রিমভাবে ঘির মতো করে তৈরি করা হচ্ছে। এরপর সেগুলো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে বাজারজাতের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। ওই অভিযানে প্রায় ৩০০ কেজি ভেজাল ঘি এবং ৭০০ থেকে ৮০০টি খালি ক্যান জব্দ করা হয়। পরে সেগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আই কিউ ফুড প্রোডাক্টস নামের ওই কারখানাকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের ওই অভিযানের কিছুদিন পরই কারখানাটি গোপনে স্থান পরিবর্তন করে পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে আমগাছতল এবং গোয়ালিয়ার ঘাটা সড়ক সংলগ্ন এলাকায় নতুনভাবে ভেজাল ঘি উৎপাদনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিন-রাত বিভিন্ন সময়ে বড় বড় ক্যানভর্তি ঘি কারখানা থেকে বের হতে দেখা যায় এবং তা ট্রাক ও পিকআপে করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
সূত্রগুলো জানায়, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে চক্রটি তাদের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এই সময় দেশে ঘির চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা বাজারে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ঘি সরবরাহ করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘি তৈরিতে কোনো ধরনের দুধ বা দুধজাত উপাদান ব্যবহার করা হয় না। বরং পাম অয়েল, ডালডা, সুজি, কৃত্রিম রং এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে তা চুলায় রান্না করে ঘির মতো রূপ দেওয়া হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে এসব মিশ্রণে আঠা জাতীয় পদার্থ এমনকি ফেভিকলের মতো কেমিক্যালও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। এতে করে পণ্যটি ঘন ও জমাট বাঁধা ঘির মতো দেখায়। পরে সেই ভেজাল পণ্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই ভেজাল ঘি শুধু চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি এবং বিয়ের ক্লাবগুলোতেই সরবরাহ করা হচ্ছে না, বরং সিন্ডিকেটের নিজস্ব পরিবহন ও পাইকারি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অজান্তেই হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই ভেজাল খাদ্য গ্রহণ করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ভেজাল খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে এতে ব্যবহৃত নিম্নমানের তেল ও রাসায়নিক পদার্থ শরীরের কিডনি, লিভার এবং হৃদযন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের খাবার গ্রহণ করলে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতী অবস্থাও সৃষ্টি করতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি না থাকায় এবং প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করার সুযোগ পাওয়ায় এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে অবাধে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, কঠোর অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের সিন্ডিকেট বন্ধ করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মো. শাহিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন এর অনুমোদন রয়েছে। তবে বিস্তারিত বিষয়ে কথা বলতে তিনি পরে সরাসরি দেখা করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, প্রশাসন ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে সমন্বয় করেই বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
এদিকে নগরবাসীর অভিযোগ, চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা সাময়িক অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও আগের মতো কার্যক্রম শুরু করে এসব চক্র।
সচেতন নাগরিকরা বলছেন, দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রমজান ও ঈদের মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ভেজাল খাদ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। চট্টগ্রামের ভেজালকারীদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না প্রশাসন এমন অভিযোগও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। নগরবাসীর ভাষ্য, যারা খাদ্যে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে তারা কোনোভাবেই মানুষ হতে পারে না। স্থানীয় প্রশাসন চাইলে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযানের মাধ্যমে খুব দ্রুতই নগরীকে ভেজালমুক্ত করা সম্ভব বলেও মনে করছেন তারা।



