অপরাধইসলাম ধর্ম

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-১ দর্জি থেকে ধনকুবের: ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিনের উত্থান ও বিতর্ক

বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার এক সময়ের সাধারণ দর্জি মোঃ মহিউদ্দিন—যিনি মানুষের কাপড় সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন—আজ তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তার এই অস্বাভাবিক উত্থান ঘিরে নানা অভিযোগ, বিতর্ক এবং দুর্নীতির গল্প এখন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুখে মুখে ঘুরছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নিয়োগ বাণিজ্য, যাকাত আত্মসাৎ, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক বিস্তৃত চিত্র।

সাধারণ জীবন থেকে হঠাৎ উত্থান

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, হাতিরপুল এলাকার ছোট্ট একটি দোকানে দর্জির কাজ করতেন মোঃ মহিউদ্দিন। আয় ছিল সীমিত, জীবনে ছিল অভাব-অনটন। কিন্তু সেই বাস্তবতা বদলে যেতে শুরু করে এক রাজনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে। জানা যায়, কৃষক লীগ নেতা হারুনুর রশিদ হাওলাদারের মাধ্যমে তার পরিচয় ঘটে এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর সঙ্গে।

অভিযোগ রয়েছে, মাত্র তিন লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একটি চাকরি পান। এরপরই যেন তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন বিপুল সম্পদের মালিক।

যাকাত আত্মসাতের অভিযোগ

মোঃ মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো যাকাতের অর্থ আত্মসাৎ। নরসিংদীতে কর্মরত অবস্থায় তিনি মাঠপর্যায়ে সংগ্রহ করা যাকাতের টাকা সরকারি তহবিলে জমা না দিয়ে নিজেই আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন। পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. মুশফিকুর রহমান তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সুনামগঞ্জে বদলি করেন।

যদিও প্রশাসনিকভাবে বদলি করা হলেও, অভিযোগ রয়েছে যে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্লট প্রতারণার কৌশল

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পে কয়েকজন কর্মকর্তা প্লট বুকিং দেন এবং কিস্তির টাকা মোঃ মহিউদ্দিনের মাধ্যমে পরিশোধ করেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি তাদের জানান, প্রকল্পটি বাতিল হয়ে গেছে এবং বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ প্লট বাতিল করেছে।

পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, সেই প্লটগুলো বাতিল হয়নি; বরং কৌশলে নিজের নামে লিখে নেন মোঃ মহিউদ্দিন। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

সম্পদের পাহাড়

বর্তমানে মোঃ মহিউদ্দিনের নামে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া তার রয়েছে দামি গাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে শত শত বিঘা জমি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার এই সম্পদ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তারা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিচয়ের রূপান্তর

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মোঃ মহিউদ্দিনের পরিচয়েও এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। এক সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন তিনি নিজেকে বিএনপি ঘরানার নেতা হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনকে অনেকেই তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে দেখছেন।

পদ-পদবির আড়ালে দুর্নীতি

বর্তমানে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রেস ম্যানেজার এবং সমন্বয় বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদগুলো তাকে আর্থিক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রেসের কাগজ ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখানো, ছাপাখানার যন্ত্রপাতি মেরামতের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় এবং ছাটপত্রি বিক্রিতে অনিয়ম—এসবের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রেস সংক্রান্ত সব কেনাকাটায় তার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। এখানে স্বচ্ছতা নেই, জবাবদিহিতাও নেই।”

প্রতিষ্ঠানজুড়ে অসন্তোষ

মোঃ মহিউদ্দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভেতরে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মনে করেন, তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তারা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন, যাতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যাচাই করা যায়।

কর্তৃপক্ষের নীরবতা

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে কেউ কেউ স্বীকার করেছেন যে, বিষয়টি তাদের নজরে রয়েছে।

স্বচ্ছতার প্রশ্ন

ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রচারের দায়িত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে প্রতিষ্ঠানটির জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা শুধু একটি ব্যক্তির দুর্নীতি নয়, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

একজন সাধারণ দর্জি থেকে কোটিপতি হওয়ার গল্প অনুপ্রেরণার হতে পারত—যদি তা হতো পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে। কিন্তু মোঃ মহিউদ্দিনের ক্ষেত্রে উঠে আসা অভিযোগগুলো সেই গল্পকে পরিণত করেছে বিতর্ক, অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রতীকে।

এখন দেখার বিষয়—কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, এবং সত্য উদঘাটনে কতটা আন্তরিক ভূমিকা পালন করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button