নিরপেক্ষতার মুখোশ ও নৈতিকতার সংকট: যখন সত্য চাপা পড়ে দলীয় স্বার্থে

বিল্লাল বিন কাশেম: এই সময়ের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে- মানুষ তার পছন্দ, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে যতটা না দ্বিধায়, তার চেয়েও বেশি দ্বিধায় তার অবস্থানকে কীভাবে উপস্থাপন করবে তা নিয়ে। কেউ দল সমর্থন করতেই পারে, কোনো মতাদর্শে বিশ্বাস রাখতেই পারে- এটি ব্যক্তি স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই অবস্থানকে আড়াল করে ‘নিরপেক্ষতা’র মুখোশ পরে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।সোজা ভাষায় বলতে গেলে- আপনি যেকোনো দল সমর্থন করতে পারেন, আপনি আপনার সুবিধামতো জীবনযাপন করতে পারেন, এমনকি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধাও নিতে পারেন- এগুলো নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে পড়ে। কিন্তু যখন আপনি নিজেকে নিরপেক্ষ, মানবতাবাদী বা সত্যের কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং একইসাথে দলীয় অপরাধকে আড়াল বা যুক্তি দিয়ে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন- তখন আপনি আর নিরপেক্ষ থাকেন না; আপনি হয়ে ওঠেন সেই অপরাধের নীরব সহযাত্রী।নিরপেক্ষতা: আদর্শ নাকি কৌশল?নিরপেক্ষতা একটি মহৎ ধারণা। এটি এমন একটি অবস্থান, যেখানে ব্যক্তি সত্য, ন্যায় ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ায়, কোনো দল বা পক্ষের অন্ধ সমর্থক না হয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা একটি ‘কৌশল’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে- নিজেকে গ্রহণযোগ্য, গ্রহণযোগ্যতার আড়ালে প্রভাবশালী করে তোলার একটি মাধ্যম হিসেবে।
এই ধরনের ‘নিরপেক্ষ’ মানুষদের ভাষা খুব পরিচিত- তারা সবসময় বলেন, “আমি কোনো দলের না”, “আমি শুধু সত্যের পক্ষে”, “আমি মানবতার কথা বলি”। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তারা নির্দিষ্ট একটি দলের অন্যায়কে নীরবে সমর্থন করছেন, বা আরও খারাপভাবে- সেই অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।এই দ্বিচারিতা সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি করে। কারণ মানুষ তখন বুঝতে পারে না- কে সত্যিই নিরপেক্ষ, আর কে কেবল নিরপেক্ষতার অভিনয় করছে।দলীয় আনুগত্য বনাম নৈতিক দায়িত্বরাজনীতি একটি স্বাভাবিক সামাজিক প্রক্রিয়া।
মানুষ তার চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী একটি দলকে সমর্থন করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সমর্থন কখনোই নৈতিক দায়িত্বের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।যখন কোনো দল গুম, খুন, দুর্নীতি বা অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে, তখন সেই দলের সমর্থক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, ভুলের সমালোচনা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই উল্টোটা করেন- তারা এই অন্যায়গুলোকে অস্বীকার করেন, ছোট করে দেখান, কিংবা যুক্তি দিয়ে সেগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন।এখানেই শুরু হয় নৈতিকতার সংকট।একজন সৎ মানুষ কখনোই অন্যায়কে সমর্থন করতে পারে না- সে যেই দলেরই হোক না কেন। কিন্তু যখন দলীয় আনুগত্য নৈতিকতার জায়গা দখল করে নেয়, তখন মানুষ নিজের বিবেককেও অস্বীকার করতে শুরু করে।‘চয়েস’ বনাম ‘দায়িত্ব’অনেকেই যুক্তি দেন- “এটা আমার চয়েস।” হ্যাঁ, আপনার চয়েস আছে। আপনি কী খাবেন, কীভাবে জীবনযাপন করবেন, কাকে সমর্থন করবেন- এসব আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু একটি সীমার পর এই ‘চয়েস’ আর ব্যক্তিগত থাকে না; এটি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করে।আপনি যদি একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হন- সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, বা সামাজিক মাধ্যমে পরিচিত মুখ- তাহলে আপনার কথার প্রভাব অনেক বেশি। তখন আপনার ‘চয়েস’ অন্যদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে, সমাজে একটি ধারা তৈরি করে।সুতরাং, তখন আপনার ওপর একটি দায়িত্বও বর্তায়- সত্যকে বিকৃত না করা, অন্যায়কে আড়াল না করা।অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার সংস্কৃতিআমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে- অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার সংস্কৃতি। কেউ গুম হলে বলা হয়- “সে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধে জড়িত ছিল”, কেউ খুন হলে বলা হয়- “এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা”, দুর্নীতির ক্ষেত্রে বলা হয়- “সবাই তো করছে”।
এই ধরনের বক্তব্যগুলো শুধু অন্যায়কে আড়াল করে না; এগুলো অন্যায়ের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে।যখন মানুষ দেখে যে অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়, বরং সেটিকে যুক্তি দিয়ে সমর্থন করা হয়- তখন সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। মানুষ বিশ্বাস হারায়- রাষ্ট্রের ওপর, আইনের ওপর, এমনকি একে অপরের ওপরও।সাহসের ভান বনাম প্রকৃত সাহসআজকাল অনেকেই নিজেকে ‘সাহসী’ হিসেবে উপস্থাপন করতে ভালোবাসেন। তারা সামাজিক মাধ্যমে শক্ত কথা বলেন, মানবতার কথা বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার দাবি করেন।কিন্তু প্রকৃত সাহস কী?প্রকৃত সাহস হলো- নিজের দলের ভুলের বিরুদ্ধে কথা বলা। প্রকৃত সাহস হলো- জনপ্রিয়তার ভয়ে চুপ না থাকা। প্রকৃত সাহস হলো- সত্যকে বলা, এমনকি তা নিজের পছন্দের বিরুদ্ধে গেলেও।যে ব্যক্তি শুধু প্রতিপক্ষের ভুল নিয়ে কথা বলে, কিন্তু নিজের দলের অন্যায় নিয়ে নীরব থাকে- সে সাহসী নয়; সে পক্ষপাতদুষ্ট।দোসর হওয়ার প্রশ্নআপনি যদি সরাসরি অন্যায় না-ও করেন, কিন্তু সেই অন্যায়কে সমর্থন করেন, বা নীরব থাকেন- তাহলে আপনি কি দায়মুক্ত?এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।ইতিহাস বলে- অন্যায় শুধু অপরাধীর কারণে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে তাদের কারণে, যারা নীরব থাকে বা তা সমর্থন করে।
একজন অপরাধী যতটা দায়ী, তার সমর্থক বা নীরব দর্শকও ততটাই দায়ী।তাই যখন কেউ নিরপেক্ষতার ভান করে অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায়, তখন তাকে ‘দোসর’ বলা অযৌক্তিক নয়। এটি কঠোর শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় কঠোরই হয়।সমাজে এর প্রভাবএই ধরনের দ্বিচারিতা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে। মানুষ বিভ্রান্ত হয়, সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। তরুণ প্রজন্ম একটি ভুল বার্তা পায়- সত্য নয়, বরং সুবিধাই শেষ কথা।ফলে একটি নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়, যেখানে মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত থাকে, এবং তা যুক্তি দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।মুক্তির পথ কোথায়?এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন কিছু মৌলিক পরিবর্তন।
প্রথমত, ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মসমালোচনা। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে- আমরা কি সত্যিই নিরপেক্ষ, নাকি নিরপেক্ষতার অভিনয় করছি?
দ্বিতীয়ত, সত্য বলার সাহস তৈরি করা। দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য নয়- সত্যের প্রতি আনুগত্যই হওয়া উচিত আমাদের মূলনীতি।
তৃতীয়ত, সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যারা প্রভাবশালী অবস্থানে আছেন, তাদের কথার জন্য জবাবদিহিতা থাকতে হবে।মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপন করবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পছন্দ কখনোই অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর অজুহাত হতে পারে না। নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা শুধু ভণ্ডামি নয়; এটি সমাজের জন্য বিপজ্জনক।সত্যকে আড়াল করে কেউ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে- অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদের পরিণতি একদিন না একদিন প্রকাশ পায়।তাই সময় এসেছে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। আপনি যদি কোনো দলের হন- তা স্বীকার করুন। কিন্তু একইসাথে ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আর যদি নিরপেক্ষ হন- তবে সত্যিকার অর্থেই নিরপেক্ষ থাকুন।কারণ, নিরপেক্ষতার ভান করে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু নিজের বিবেককে প্রতারিত করা নয়- এটি একটি পুরো সমাজকে বিভ্রান্ত করার শামিল।এবং তখন, আপনাকে দোসর বলা হলে-তার দায় এড়ানোর কোনো পথ থাকে না।
লেখক: কবি ও কথা সাহিত্যিক bbqif1983@gmail.com



