অনুসন্ধানচট্টগ্রামপ্রশাসন

ঘুষ আর মাদক ব্যবসার টাকায় বাকলিয়ার দেওয়ান বাজারে ওসি শরীফের আলীশান প্রাসাদ

এম জসিম উদ্দিন, জেলা প্রতিনিধি চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সদরঘাট থানা থেকে প্রত্যাহার করা ওসি মুহাম্মদ শরীফের কুকীর্তির শেষ নেই । তার বিরুদ্ধে পাহাড় সমান অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের উর্দ্বতন কতৃপক্ষ ।
সিএমপির এক মুখপাত্র গত বৃহস্পতিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেন। সিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী গত রবিবার ৬ জুলাই ২০২৬ ইংরেজি রাতে তাকে থানা থেকে প্রত্যাহার করে লাইনে সংযুক্ত করার আদেশ জারি করেন।
এর আগে এ্কই দিন পুলিশ মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) পাঠানো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ অধিশাখার উপসচিব নাসরিন সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত থেকে দুর্নীতি, মরণ নেশা ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অবৈধ আর্থিক লেনদেন, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, কথায় কথায় সাংবাদিকদের গায়েবি মামলার হুমকি এবং ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের মতো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওসি শরীফের রয়েছে বাকলিয়া এলাকার দেওয়ান বাজারে আলিশান প্রাসাদ। বাড়ির বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি একেক সময় একেক ধরনের জবাব দিয়ে ফোন কেটে দেয়। একবার বলে বাড়িটি শাশুড়ীর নামে, কাউকে বলে স্ত্রীর নামে, আবার কাউকে বলে ব্যাংক এশিয়ার নামে। সত্য গোপন ও অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে তিনি সাংবাদিকদের বারবার বিভ্রান্তিতে ফেলে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে আবার মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর শরীফকে কর্ণফুলী থানা থেকে সিএমপির বিশেষ শাখায় বদলি করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর সেখান থেকে তাকে অ্যাস্টেট এন্ড বিল্ডিং শাখার পরিদর্শক হিসেবে বদলি করা হয়। কর্ণফুলি থানায় কর্মরত অবস্থায় সেনাবাহিনীর একটি দল কর্ণফুলি থেকে তিনজন চাঁদাবাজকে হাতেনাতে আটক করে থানায় সোপর্দ করলে কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে গভীর রাতে তিন চাঁদাবাজকে ছেড়ে দেয় ওসি শরীফ। এধরণের অনৈতিক কর্মকান্ড ভবিষ্যতে যেন পূণরাবৃত্তি না ঘটে সেনাবাহিনী সরাসরি থানায় গিয়ে শরীফকে কড়া সতর্ক করে। স্টেড এন্ড বিল্ডিং শাখার পরিদর্শক থেকে গত ১৮ জুন তাকে সদরঘাট থানার ওসি পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সিএমপির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কর্ণফুলী থানায় ব্যাপক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ মাথায় নিয়েও সম্প্রতি আবার ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন মুহাম্মদ শরীফ। বিভিন্ন থানায় ওসি পদায়নে পর্দার আড়াল থেকে ভূমিকা রেখেছিলেন। রাজনৈতিক নানা বিতর্ক তুলে দক্ষ ও চৌকস হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করতে তিনি কলকাঠি নাড়েন।
তথ্যমতে, সিএমপির গোয়েন্দা ইউনিটের (ডিবি-দক্ষিণ) পরিদর্শক পদে দায়িত্বরত অবস্থায় মুহাম্মদ শরীফকে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন হয়েছিল। কর্ণফুলিতে যোগদানের পর দক্ষিণ চট্টগ্রামের মাদক সম্রাট নামে খ্যাত আনোয়ারার কানা মান্নানের সাথে গোপনে ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা শুরু করে শরীফ। ওসি শরীফের বিষয়ে ১১ নং জুঁইদন্ডি ইউনিয়নের প্রাক্তন এক ইউপি সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ৯/১০ বছর ধরে মাদক কারবারি হানা মান্নানের সাথে শরীফের দহরমমহরম সম্পর্ক। সে সুবাদে হানা মান্নানের সামাজিক সব অনুষ্ঠানে শরীফের সরব উপস্থিতি এলাকায় গুঞ্জন সৃষ্টি হতো। এছাড়াও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) চট্টগ্রামে সাবেক উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমার সাথেও রয়েছে মাদক কারবারি হানা মান্নান ও ওসি মোহাম্মদ শরীফের অন্যরকম সম্পর্ক। মুকুল চাকমাও কানা মান্নানের সামাজিক সব অনুষ্ঠানে সরব থাকতেন। এই ইউপি সদস্য বলেন কোরবানের পর হানা মান্নান বিশাল এক মেজবানের আয়োজন করেন। সেই মেজবানে শরীফ সহ তার সঙ্গীয় ফোর্স অংশ নেয়। ওরা সবাই ছিল সাদা পোশাকে। অভিযোগ রয়েছে কর্ণফুলি থানায় যোগদানের দেড়মাস মাস পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন তালুকদারের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ওসি। চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের এক ব্যবসায়ী ও এক ইউপি সদস্যকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পথে গাড়ি থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং গ্রেপ্তার বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তখন তার বিরুদ্ধে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে চরলক্ষ্যা ইউনিয়নে ১০ বছর বয়সি শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের নামে অর্থ আদায় এবং পরে শিশুটির মাকে বিষয়টি চেপে যেতে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে ওসি শরীফের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী। কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ থাকাসহ আরও নানা অভিযোগে তিনি আলোচিত ছিলেন।

এছাড়া সিআইডির পরিদর্শক থাকার সময় বিদেশি মুদ্রা উদ্ধারের এক মামলার তদন্ত নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে শরীফের বিরুদ্ধে। এজন্য ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ওসি শরীফকে সশরীরে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। জব্দ করা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত (প্রমাণ) আদালতে জমা না দিয়েই এবং নিজের হেফাজতেও সংরক্ষণ না করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন তিনি।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, “ওসি মুহাম্মদ শরীফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে সিএমপি। তিনি বলেন সিএমপি কমিশনারের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হতে যাচ্ছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button