অনুসন্ধানঅভিযান

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় এক বিদ্যালয়ে দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান

মুহম্মদ তরিকুল ইসলামপ্রতিনিধিঃ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শালবাহান দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করার অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। এর মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধেই আগে থেকেই রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। একজন এসএসসি পরীক্ষার খাতা সংক্রান্ত ভাইরাল ভিডিওর ঘটনায় সমালোচিত, অন্য জনের বিরুদ্ধে রয়েছে জাল সনদ ব্যবহার করে অতিরিক্ত বেতন উত্তোলনের অভিযোগ। তবে অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।  

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়ের সহকারী কৃষি শিক্ষক সোহেল রানা কয়েকদিন আগে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়েন। ভিডিওতে তাকে একটি কক্ষে এসএসসি পরীক্ষা খাতার অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) শিটে কলম দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করতে দেখা যায়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় তার বিরুদ্ধে নকল বানিজ্য, পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়া, টাকার বিনিময়ে পাশ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনার পরও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে

অন্যদিকে একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধেও ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও মারধরের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত এই দুই শিক্ষককেই একই পদে দায়িত্ব দেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে।

বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আফরোজী বেগম গত ২৯ জুন তার শেষ কর্মদিবসে লিখিতভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব বুঝে দেয় সহকারী শিক্ষক মামুনুর রশিদকে। কিন্তু পরদিন ৩০ জুন নবগঠিত এডহক কমিটি পৃথক সিদ্ধান্তে রেজুলেশনের মাধ্যমে সোহেল রানাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তবে রেজুলেশনে সদস্য সচিব (প্রধান শিক্ষক) এর স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও সেদিন কেবলমাত্র নবগঠিত সভাপতির স্বাক্ষরিত রেজুলেশন দেখাতে সক্ষম হোন সোহেল রানা।    

এডহক কমিটির এই সিদ্ধান্তে খুশি হয়ে সহকারী শিক্ষক সোহেল রানা গত ৩০ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজেকে বিদ্যালয়ের ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক’ উল্লেখ করে একটি স্ট্যাটাস প্রকাশ করেন। এর পরেই বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার জন্ম নেয়।

এ বিষয়ে সোহেল রানা বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি। বিষয়টি নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। পঞ্চগড় কমিউনিটি নিউজ (ইংরেজি) ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে সম্পাদিত বলে দাবি করেন অতঃপর বলেন, ভিডিওটি ২০২৫ সালের এবং তিনি পরীক্ষার খাতায় রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর মিলিয়ে দেখছিলেন। তার দাবি, প্রতিপক্ষ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে।

অপরদিকে সহকারী শিক্ষক মামুনুর রশীদ বলেন, বিদায়ী প্রধান শিক্ষক আমাকে লিখিতভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। সেই দায়িত্বপত্রের ভিত্তিতেই আমি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, লিখিতভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দায়িত্ব পেলেও সোহেল রানা আগেভাগেই অবৈধ উপায়ে রেজুলেশন তৈরি করে তার চেয়ারে বসে পড়েন। তার দাবি সোহেল রানা জোর করে প্রধান শিক্ষকের চেয়ার দখল করেছেন।    

এদিকে বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আফরোজী বেগম জানান, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সোহেল রানার দায়িত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ থাকায় তিনি নিয়মানুযায়ী পরবর্তী জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মামুনুর রশিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। প্রধান শিক্ষকতা হস্তান্তরের পর এডহক কমিটির অনুমোদনের বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি বলেন, অনুমোদিত এডহক কমিটিতে যে সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে ওই সূত্রে তিনি তার সময়ে দিনাজপুর বোর্ডে কোনো আবেদন পাঠায়নি।

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শওকত আলী সাংবাদিককে বলেন, তাদের দপ্তরে সোহেল রানাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও মামুনুর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। ওএমআর শিটের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় সোহেল রানাকে শোকজ করেছে উপজেলা প্রশাসন। তিনি ব্যাখা না দিয়ে সময় চেয়ে গেছেন।  

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা সুলতানা (অ.দা.) বলেন, কয়েকদিন হয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিষয়টি বিস্তারিত জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button