⭕ নবী ﷺ কি নূরের তৈরি? ⭕

⁉️প্রশ্ন : আমি দু’টি কিতাবে পড়েছি নবী ﷺ আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি, আল্লাহ তাকে স্বীয় নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তার কারণে অন্যান্য মখলুক সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমার জ্ঞান পরিপক্ক নয়, অতএব আমাকে স্পষ্ট করে বলুন। শোকরান।‼️
✅উত্তর : আলহামদুলিল্লাহ, এ জাতীয় একটি প্রশ্ন সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড ‘লাজনায়ে দায়েমা’র নিকট করা হয়েছিল, আমরা এখানে প্রশ্নসহ তা উল্লেখ করছি।
⁉️প্রশ্ন : অনেক মানুষের বিশ্বাস, সকল বস্তু মুহাম্মদ ﷺ এর নূর থেকে সৃষ্টি, আর তার নূর আল্লাহর নূর থেকে সৃষ্টি। তারা এ মর্মে হাদিস বর্ণনা করে: “আমি আল্লাহর নূর, আর প্রত্যেক বস্তু আমার নূর থেকে সৃষ্ট”। তারা আরো বর্ণনা করে: “আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম মুহাম্মদ ﷺ-এর নূর সৃষ্টি করেছেন”। এ জাতীয় হাদিসের কোনো ভিত্তি আছে কি? তাদের আরেকটি হাদিস নিম্নরূপ: أنا عرب بلا عين أى رب أنا أحمد بلا ميم أي أحد আমি আরব আইন ব্যতীত অর্থাৎ আমি رب রব, আমি আহমদ মীম ব্যতীত অর্থাৎ আমি أحد আহাদ, একক সত্ত্বা বা আল্লাহ। এ জাতীয় কথার কোনো ভিত্তি আছে কি?‼️
✅উত্তর : আলহামদুলিল্লাহ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আল্লাহর নূর যদি এ অর্থে বলা হয় যে, তিনি আল্লাহর জাতি ও সত্ত্বাগত নূর, তাহলে তা কুরআন বিরোধী, কারণ কুরআনে তাকে মানুষ বলা হয়েছে। আর যদি তাকে এ অর্থে নূর বলা হয় যে, তার নিকট আল্লাহর কাছ থেকে নূর বা ওহী এসেছে, যা মানুষের হিদায়েতের উসিলা, যা দ্বারা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়েত করেন, তাহলে এ অর্থ ঠিক আছে। ‘লাজনায়ে দায়েমাহ’ থেকে এ বিষয়ে একটি ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছে, এখানে হুবহু তা উল্লেখ করছি।
নবী ﷺ নূর অর্থ তার মধ্যে বিদ্যমান রিসালাত ও হিদায়েতের নূর, যে নূর দ্বারা আল্লাহ স্বীয় বান্দাদের থেকে যাকে ইচ্ছা হিদায়েত করেন। এ নূর আল্লাহ প্রদত্ত।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وما كان لبشر أن يكلمه الله إلا وحيا أو من وراء حجاب أو يرسل رسولا فيوحي بإذنه ما يشاء إنه علي حكيم وكذلك أوحينا إليك روحا من أمرنا ما كنت تدري ما الكتاب ولا الإيمان ولكن جعلناه نورا نهدي به من نشاء من عبادنا وإنك لتهدي إلى صراط مستقيم * صراط الله الذي له ما في السماوات وما في الأرض ألا إلى الله تصير الأمور
“কোনো মানুষের এ মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোনো দূত পাঠানো ছাড়া। তারপর আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে তিনি যা চান তাই ওহী প্রেরণ করেন। তিনি তো মহীয়ান, প্রজ্ঞাময়। অনুরূপভাবে উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতিতে আমি তোমার কাছে আমার নির্দেশ থেকে ‘রূহ’কে ওহী যোগে প্রেরণ করেছি। তুমি জানতে না কিতাব কী এবং ঈমান কী? কিন্তু আমি একে আলো বানিয়েছি, যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়েত দান করি। আর নিশ্চয় তুমি সরল পথের দিকে নির্দেশনা দাও। সেই আল্লাহর পথ, যিনি আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে তার মালিক। সাবধান! সব বিষয়ই আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে (১)
এ নূর নবী ﷺ-এর সাধনায় লব্ধ নূর নয়, যেমন অনেক জিন্দিক ও বদ্বীন ধারণা করে। তিনি রক্ত, মাংস ও হাড্ডির সমন্বিত মানুষ ছিলেন। চিরাচরিত নিয়ম পিতা-মাতার সমন্বয়ে তার সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্মের পূর্বে কখনো তার সৃষ্টি হয়নি।
আর কতক মানুষ যা বলে: “আল্লাহ তা’আলা সর্বপ্রথম নবী ﷺ-এর নূর সৃষ্টি করেছেন”। অথবা বলে: “আল্লাহ তা’আলা স্বীয় চেহারা থেকে একমুষ্টি নূর গ্রহণ করেন, সে মুষ্টিই হচ্ছে মুহাম্মদ ﷺ। অতঃপর আল্লাহ তার দিকে দৃষ্টি দেন, ফলে তাতে বহু নূরের জ্যোতি ছিটকে পড়ে, যার প্রত্যেক টুকরো থেকে তিনি একজন করে নবী সৃষ্টি করেছেন। অথবা আল্লাহ তা’আলা নবী ﷺ-এর নূর থেকে সকল মখলুক সৃষ্টি করেছেন”। এ হাদিস ও এ জাতীয় অন্যান্য হাদিস নবী ﷺ থেকে প্রমাণিত নয়। পূর্বের ফতোয়া থেকে স্পষ্ট এ জাতীয় বিশ্বাস বাতিল (২)
এ ছাড়া আরো বর্ণনা করা হয় যে, أنا عرب بلا عين ‘আমি আরব আইন ব্যতীত’, অথবা বলা হয় أنا أحمد بلا ميم ‘আমি আহমদ মীম ব্যতীত’ তার কোনো ভিত্তি নেই। আল্লাহর রুবুবিয়াতের কোনো সিফাত, অথবা আল্লাহর সাথে খাস কোনো সিফাত দ্বারা কাউকে ভূষিত করা বৈধ নয়, এ জাতীয় সিফাত একমাত্র আল্লাহর সাথেই খাস, অতএব কাউকে ‘রব’ বলা কিংবা কাউকে ‘একক সত্ত্বা’ বলা বৈধ নয়। কোনো রাসূল বা কোনো মখলুককে রব বা একক সত্ত্বাবলে আখ্যায়িত করা বৈধ নয়। সাল্লাল্লাহু ‘আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মদ ওয়া আলিহি, ওয়া সাহবিহি ওয়া সাল্লাম (৩)
⁉️একটি প্রশ্ন : এ কথা কি বলা যাবে যে, আল্লাহ তা’আলা নবী ﷺ-কে সৃষ্টি করেছেন বলেই আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন? বলা হয়: “যদি নবী না হতেন আসমানসমূহ সৃষ্টি করা হত না”। এ কথার অর্থ কি, হাদিসটি কি সহি? বিষয়টি আমাদের সামনে স্পষ্ট করুন।‼️
✅উত্তর : আলহামদুলিল্লাহ,
নবী ﷺ এর জন্য আসমান ও জমিন সৃষ্টি করা হয়নি, বরং আসমান ও জমিন সৃষ্টির কারণ আল্লাহ তা’আলা নিম্নের আয়াতে বলে দিয়েছেন:
الله الذي خلق سبع سماوات ومن الأرض مثلهن يتنزل الأمر بينهن لتعلموا أن الله على كل شيء قدير وأن الله قد أحاط بكل شيء علما. الطلاق : ١٢
তিনি আল্লাহ, যিনি সাত আসমান এবং অনুরূপ জমিন সৃষ্টি করেছেন, এগুলির মাঝে তাঁর নির্দেশ অবতীর্ণ হয় যেন তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান এবং আল্লাহর জ্ঞান তো সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে (৪)
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদিস নবী ﷺ-এর উপর মিথ্যা অপবাদ, তার কোনো ভিত্তি নেই। হে আল্লাহ আমাদের নবী, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সকল সাথীর উপর সালাত ও সালাম নাযিল করুন।
এ বিষয়ে আত তাহরীক পত্রিকার ফাতওয়া নিচে তুলে ধরা হলো :
রাসূলুল্লাহ ﷺ মাটির মানুষ ছিলেন; নূরের তৈরী নন। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! ‘তুমি বলে দাও, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মত একজন মানুষ মাত্র। আমার নিকট ‘অহি’ করা হয় …’ (১) এটা কেবল আমাদের নবীই নন, বরং বিগত সকল নবীই স্ব স্ব কওমের উদ্দেশ্যে একথা বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের মত মানুষ মাত্র’ (২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ‘আমি তো একজন মানুষ। আমিও তোমাদের মত ভুলে যাই। সুতরাং আমি ভুলে গেলে তোমরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ো (৩) তিনি বলেন, আমি একজন মানুষ। আমি তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে কোন কিছু আদেশ করলে তা গ্রহণ করবে। আর নিজস্ব রায় থেকে কিছু বললে আমি একজন মানুষ মাত্র। অর্থাৎ সে ক্ষেত্রে আমার ভুলও হ’তে পারে (৪)
বস্ত্ততঃ ফেরেশতারা হ’ল নূরের তৈরী, জিনেরা আগুনের তৈরী এবং মানুষ হ’ল মাটির তৈরী (৫) উল্লেখ্য যে, রাসূল ﷺ নূরের তৈরী ছিলেন মর্মে সমাজে কিছু হাদীছ প্রচলিত রয়েছে। যেমন ‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেন’। এ মর্মে বর্ণিত সব বর্ণনাই জাল (৬)
সূরা মায়েদাহ ১৫ আয়াতে বলা হয়েছে, قدْ جاءَكمْ من الله نوْرٌ وَكتابٌ مبيْنٌ ‘তোমাদের কাছে এসেছে একটি জ্যোতি এবং একটি সমুজ্জ্বল গ্রন্থ’। উক্ত আয়াতে ‘নূর’ বা জ্যোতি দ্বারা কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ কুরআন শিরকের অন্ধকার হ’তে মানুষকে তাওহীদের আলোর পথে বের করে আনে। এখানে ‘ওয়া কিতাবুম মুবীন’ وكتابٌ مبين তার পূর্ববর্তী ‘নূর’ نورٌ এর উপর عطف بيان হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ বলছেন, ‘তোমাদের কাছে আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে একটি জ্যোতি ও সমুজ্জ্বল গ্রন্থ’। যেমন ইতিপূর্বে সূরা নিসা ১৭৪-৭৫ আয়াতে برهانٌ ও نوْرا مبيْنا বলে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। অমনিভাবে সূরা আ‘রাফ ১৫৭ আয়াতের কুরআনকে ‘নূর’ বলা হয়েছে।
উক্ত আয়াতের তাফসীরে ‘নূর’-এর ব্যাখ্যায় যাজ্জাজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, এখানে মুহাম্মাদ ﷺ-কে বুঝানো হয়েছে (৭) যদি সেটাই ধরে নেওয়া হয়, তাহ’লেও এর অর্থ এই নয় যে, মুহাম্মাদ ﷺ নূরের তৈরী ছিলেন। কারণ কুরআনেই বলা হয়েছে যে, তিনি তোমাদের মত মানুষ ছিলেন (৮) আর মানুষ বলেই তো তিনি পিতা-মাতার সন্তান ছিলেন এবং সন্তানের পিতা ছিলেন। তিনি খানা-পিনা ও বাজার-ঘাট করতেন। অতএব রাসূল ﷺ যে মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
প্রথম ফাতওয়ার তথ্য সুত্র :
[১] সূরা আশ-শুরা: ৫১-৫৩। [২] লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহূসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা, ফাতাওয়া লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ১/৩১০। [৩] লাজনাহ আদ-দায়িমাহ লিল-বুহূসিল ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা, ফাতাওয়া লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ১/৩১০। [৪] সূরা আত-তালাক: ১২।
দ্বিতীয় ফাতওয়ার তথ্য সুত্র :
[১] আল-কুরআন, সূরা আল-কাহ্ফ ১৮:১১০। [২] আল-কুরআন, সূরা ইবরাহীম ১৪:১১। [৩] ছহীহ বুখারী, ৪০১; ছহীহ মুসলিম, ৫৭২; মিশকাত, ১০১৬ ‘সিজদায়ে সহো’ অনুচ্ছেদ। [৪] ছহীহ মুসলিম, ২৩৬৫; মিশকাত, ১৪৭। [৫] ছহীহ মুসলিম, ২৯৯৬; মিশকাত, ৫৭০১; আল-কুরআন, সূরা আল-মুমিনূন ২৩:১২; সূরা আল-আন‘আম ৬:২। [৬] ‘আজলূনী রহিমাহুল্লাহ, কাশফুল খাফা, ৮২৭; আলবানী রহিমাহুল্লাহ, ছহীহাহ, ৪৫৮-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য। [৭] ইমাম কুরতূবী রহিমাহুল্লাহ, তাফসীরে কুরতূবী সূরা আল-মায়েদাহ ৫:১৫-এর তাফসীর। [৮] আল-কুরআন, সূরা আল-কাহফ ১৮:১১০। উৎস : আত তাহরীক, ডিসেম্বর ২০১৪
🚥🚥🌺🚥🚥🌺🚥🚥🌺🚥🚥🌺🚥🚥



