আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ভালবাসার প্রমাণ দিয়েছেন।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ভালবাসার প্রমাণ দিয়েছেন।
সকল বান্দাহর প্রতিই তাঁর ভালবাসা অফুরন্ত!
গোনাহগার বান্দাহকে তিনি ক্ষমা করতে ভালবাসেন। আবার কোন বান্দাহকে তিনি ভালবাসেন তার আমল ও তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয়ে পাপ থেকে ফিরে আসার ও নেক কাজের জন্য।
৪ টি আমল দেখেই চেনা যায় তাদের। নিচে হাদিসের আলোকে আলামতগুলো বর্ণনা করা হল।
৪ টি আলামতে বুঝবেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আপনাকে ভালবাসেন।
সে ৪ টি আমল পর্যায়ক্রমে দেওয়া হল ———-
১) মানুষ তাকে ভালবাসবে।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন ————
“যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কোন বান্দাহকে ভালবাসেন, তখন জিব্রাইল (আঃ) কে ডেকে বলেন — “আমি অমুক ব্যক্তিকে ভালবাসি, তুমিও তাকে ভালবাস।”
রাবি বলেন — অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) ও তাকে ভালবাসতে থাকেন এবং আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা অমুক ব্যক্তিকে ভালবাসেন, তোমরাও তাকে ভালবাস।
তখন আকাশের অধিবাসীরাও তাকে ভালবাসতে শুরু করেন। অতঃপর সেই ব্যক্তির জন্য জমিনেও স্বীকৃতি স্থাপন করা হয়।
আর যখন আল্লাহ্ কাউকে ঘৃণা করেন, তখন জিব্রাইল (আঃ) কে ডেকে বলেন — “আমি অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করি, তুমিও তাকে ঘৃণা কর।”
অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) তাকে ঘৃণা করেন এবং আকাশে ঘোষণা করে দেন যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন, তোমরাও তাকে ঘৃণা কর এবং আকাশবাসীরাও তার প্রতি ঘৃণা পোষণ করেন। অতঃপর তার জন্য জমিনেও ঘৃণা স্থাপন করা হয়।”
(মিশকাত শরীফ, হাদিস নং — ৫০০৫, সহীহ্ মুসলিম, হাদিস নং — ১৫৭/২৬৩৭৮, সহীহ্ জামে, হাদিস নং — ২৫৮৫, আহমদ, হাদিস নং — ৮৫০০)
এখানে উল্লেখ্য — অনেক বেঈমানকেও মানুষ ভালবাসে। তাদেরও বহু ফ্যান-ফলোয়ার আছে।
তাহলে তাদেরকেও আল্লাহ্ ভালবাসেন??
না, তাদেরকে আল্লাহ্ ভালবাসেন না।
এখানে ‘জমিনওয়ালাদের ভালবাসা’ বলতে মূলত ঈমানদার বা মুমিনদের ভালবাসা বোঝান হয়েছে।
অর্থাৎ, আল্লাহ্ যে বান্দাহকে ভালবাসেন, তাকে মুমিন বা নেককারদের পছন্দের ব্যক্তিতে পরিণত করবেন।
এখান থেকে বোঝা যায়, মুত্তাকী বা নেককার ব্যক্তিরা সবাই কাউকে ভালবাসলে, বুঝতে হবে, আল্লাহও তাকে ভালবাসেন।
আর আল্লাহর ভালবাসা অর্জন করতে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা চেয়ে বেড়ানোর দরকার নেই।
সঠিক পথে চললে আল্লাহ্ ই তার প্রতি মানুষের ভালবাসা সৃষ্টি করে দেবেন!
২) বিপদ-আপদ লেগে থাকবে, তবুও তিনি আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট।
বিপদে-মসিবতে সন্তুষ্ট চিত্তে থাকেন, এমন বান্দাহকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ভালবাসেন।
আল্লাহ্ ইব্রাহীম (আঃ) এর অনেক পরীক্ষা নিয়েছেন। কুরআনের কোথায়ও বলা হয়নি যে, আল্লাহ্ ফেরাউন বা নমরুদের পরীক্ষা নিয়েছেন।
বরং তিনি তাঁর ভালবাসার বান্দাহদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন।
তাই বহু ঈমানদারদের জীবনে দেখবেন দুঃখ-কষ্ট ও বিপদাপদ লেগেই থাকে।
এর কারন ব্যাখ্যা করে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন ———–
“মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার সদৃশ ও কাফিরের জন্য জান্নাত সদৃশ।”
(সহীহ্ মুসলিম, হাদিস নং — ২৯৫৬)
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আরও বলেন ————-
“আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা যখন তাঁর কোন বান্দাহর মঙ্গল সাধনের ইচ্ছা করেন তখন দুনিয়ায় তাকে তারাতাড়ি বিপদাপদের সম্মুখীন করেন। আর যখন তিনি কোন বান্দাহর অকল্যাণের ইচ্ছা করেন, তখন তার গোনাহের শাস্তি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। অবশেষে কিয়ামতের দিন তাকে এর পরিপূর্ণ শাস্তি প্রদান করেন। আর আল্লাহ্ কোন সম্প্রদায়কে ভালবাসেন, তখন তাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেন। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য (আল্লাহর) সন্তুষ্টি থাকে। আর যে তাতে অসন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য (আল্লাহর) অসন্তুষ্টি থাকে।”
(তিরমিযী, হাদিস নং — ২৩৯৬, সহিহাহ্, হাদিস নং — ১২২০, মিশকাত, হাদিস নং — ১৫৬৫)
৩) দুনিয়ামুখিতা থাকবে না।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা যাকে ভালবাসবেন, তার মধ্যে পদ-পদবী, অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ; এসব দুনিয়াবি কোন কিছুতেই তার আকর্ষণ থাকবে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কিছু বান্দাহকে ভালবেসে এসব থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।
চাইলেও তাকে এসব কিছু দেওয়া হয় না।
মূলত আল্লাহ্ সেই বান্দাহকে পরিকল্পিতভাবে দুনিয়াবি ফায়দা থেকে সরিয়ে রাখেন।
সুবহান আল্লাহ্।
এ বিষয়ে অনেক হাদিস রয়েছে। তার মধ্যে একটি হাদিস হল —————-
কাতাদা ইবনে নুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন ————–
“আল্লাহ্ যখন কোন বান্দাহকে ভালবাসেন, তাকে দুনিয়া (প্রাচুর্য) থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। যেমন তোমাদের কেউ তার রোগীকে (পানি স্পর্শ করলে যার অসুবিধা হবে, তাকে) পানি থেকে বাঁচিয়ে রাখে।”
(তিরমিযী, হাদিস নং — ২০৩৬)
তবে একথার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা কাউকে দুনিয়া দিলে তিনি আল্লাহর ঘৃণিত ব্যক্তি হয়ে যাবেন।
প্রিয় বান্দাহদের অনেককেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা দুনিয়ার প্রাচুর্যও দিয়েছেন। এসব ব্যক্তিদের মধ্যে ওসমান (রাঃ), সোলাইমান (আঃ), দাঊদ (আঃ) সহ অনেকেই রয়েছেন।
তবে তাঁদের কারও মধ্যেই দুনিয়াপ্রীতি ছিল না।
এসব বান্দাহদের আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা দুনিয়াও দিয়েছেন আবার ভালও বেসেছেন।
৪) দ্বীনি জ্ঞানের অধিকারী এবং নেক আমল করার অবারিত সুযোগ।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লার ভালবাসার বানদাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হল — তাকে আল্লাহ্ দ্বীনের বুঝ দান করবেন এবং সে অনুযায়ী বেশি বেশি নেক আমল করার সুযোগ দান করবেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন ————-
“আল্লাহ্ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের প্রজ্ঞা দান করেন। আল্লাহ্ ই দানকারী আর আমি বন্টনকারী।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদিস নং — ৭১, সহীহ্ মুসলিম, হাদিস নং — ১০৩৭, মিশকাত শরীফ, হাদিস নং — ২০০)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেছেন ————-
“আল্লাহ্ যখন কোন বান্দাহর কল্যাণের ইচ্ছা করেন, তাকে মৃত্যুর আগে পবিত্র করেন।”
লোকেরা জিজ্ঞেস করল, পবিত্র করেন কিভাবে?
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন —- “মৃত্যুর আগে তাকে নেক আমলের তৌফিক দেন। অতঃপর তার উপর তার মৃত্যু হয়।”
(সহিহুল জামে, হাদিস নং — ৩০৬)
অনত্র রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন ———–
“আল্লাহ্ যখন কোন বান্দাহর কল্যাণ চান, তখন সে বান্দাহকে সুমিষ্ট করেন।”
জিজ্ঞেস করা হল, সুমিষ্ট কি?
জবাবে রাসূলে আকরাম (সাঃ) বললেন —- “মৃত্যুর আগে ভাল কাজ তার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। অতঃপর এর উপরই তার মৃত্যু হয়।”
(আহমদ, হাদিস নং — ১৭৮১৯, সহীহ্ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং — ৩৪২, সহীহাহ্, হাদিস নং — ১১১৪)
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাকে, আপনাকে, সকল মুসলিম উম্মাহ্ উম্মাহতিকে তাঁর ভালবাসা পাওয়ার মত আমল করার তৌফিক দান করুন।
আমীন। আমীন ইয়া রব্ব।।



