সাভার ডিবির এস আই মতিউর ও মেহেদীর ঘুষ বানিজ্য ৩৮ লাখের ভাগ কি বড় বাবুদের পকেটেও পৌঁছেছে?

মাহবুব আলম মানিক (সাভার উপজেলা প্রতিনিধি): ঢাকার সাভারে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি অভিযানিক দলকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মতিউর রহমান ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মেহেদী। গত দুই মাসে মাদক কারবারিদের আটক করে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ সামনে এনে এবং অর্থ লেনদেনের বিবরণ দিয়ে গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১১ মিনিটে (NPB) নামক সংবাদ মাধ্যমে একটি তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশ করা হয়।
যেখানে বলা হয়,শিল্পাঞ্চল সাভারে দিনদিন ছড়িয়ে পড়ছে মাদকের ভয়াবহতা। নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার আর মামলা দায়ের করেও কোনোভাবেই এর বিস্তারের লাগাম টানা যাচ্ছে না। মাদক নিয়ন্ত্রণের এই চরম ব্যর্থতার নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে কারবারিদের ছেড়ে দেওয়াসহ নানা কারণে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাদক কারবারিরা।
টাকা দিলেই মাদককারবারিকে মুক্তি, এসআই মতিউরের পকেটে দুই মাসেই ৩৮ লাখ!
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাভারে নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা জেলা উত্তর (ডিবি) পুলিশ। এসব অভিযানে মাদক উদ্ধার ও মামলা দায়েরের তথ্য পাওয়া গেলেও এর আড়ালে রয়েছে গা শিউরে উঠার মতো অনিয়মের তথ্য। গত দুই মাসে ডিবির একটি অভিযানিক দলের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের আটকের পর টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিয়ে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য মিলেছে। আর এসব কারবারিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মাদকের হদিস নেই কারও কাছে। এমনকি বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ করা হলেও টাকার বিনিময়ে সামান্য গাঁজা উদ্ধার দেখিয়ে মামলা দায়েরেরও অভিযোগ রয়েছে।
বেশকিছু দিন পূর্বে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকা থেকে এক নারী মাদককারবারীকে আটক করে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন এস আই মতিউর ও এএসআই মেহেদী। প্রতিবেদকের সাথে ওই নারী মাদক কারবারির কথা হলে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, নিশ্চিন্তপুরের বুড়িপাড়া এলাকায় একটি ঝালমুড়ির দোকানের সামনে থেকে হঠাৎ টেনেহিঁচড়ে আমাকে একটি রিকশায় তুলে নরসিংহপুর বাস স্ট্যান্ডে নেওয়া হয়। পরে ডিবির হায়েস মাইক্রোবাসে তুলে জোরপূর্বক হাতে হেরোইন দিয়ে ছবি তোলে তারা। আমি হেরোইন হাত থেকে ফেলে দিলে নারী কনস্টেবল আমাকে ব্যাপক মারধর করে। পরে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে আমাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয় ডিবি পুলিশ। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজসহ আমাকে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিলে তারা আমাকে সাভার বাস স্ট্যান্ডে ছেড়ে দেয়। টাকা পেয়ে আগামী তিন বছর নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা পরিচালনার বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেয় ডিবি পুলিশ। তবে ঘটনার দিন থেকে কমপক্ষে তিনদিন আমাকে এলাকার বাইরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পুলিশি হয়রানি এড়াতে ঘটনাস্থলের ঝালমুড়ি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনপিবি নিউজকে বলেন, আমার সামনে থেকেই ওই নারীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আমার সামনে কোনো প্রকার মাদক উদ্ধার করতে দেখিনি। ওই নারী মাদকের কারবার করেন কি না জানা নেই, তবে ঘটনাস্থল থেকে কোনো প্রকার মাদক উদ্ধার করা হয়নি।
শুধু এই নারী মাদক কারবারিই নয়, গত ৩০ আগস্ট আশুলিয়ার কাইচাবাড়ি এলাকা থেকে ১ হাজার পিস ইয়াবা ও ৪ কেজি গাঁজাসহ জাফর এবং নাছিমা নামের দুই মাদক কারবারিকে আটক করে ডিবির মতিউর ও এএসআই মেহেদীসহ তাদের টিম।
ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ডিবি পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জাফর এবং নাছিমা নামের দুই মাদক কারবারিকে আটকের পর প্রথমে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে নাছিমাকে ছেড়ে দেয়। যে নাসিমা গত তিনদিন আগে ময়মনসিংহে ২০০ কেজি গাঁজাসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। এই টাকা ডিবি অফিসের নিকটবর্তী সুমনের বিকাশের দোকানের মাধ্যমে আদায় করা হয়
অন্যদিকে, আটক মাদক কারবারি জাফরকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ৪ কেজি গাঁজার পরিবর্তে তার বিরুদ্ধে মাত্র আধা কেজি গাঁজার মামলা দেওয়া হয়। এসব টাকার মধ্যে ৪ লাখ টাকা হেমায়েতপুরের একটি ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে তোলা হয় এবং বাকি ৫৫ হাজার টাকা জাফরের স্ত্রীর বিকাশ নম্বর, যার শেষ সংখ্যা ৩২৩ থেকে সুমনের দোকানের বিকাশ (যার শেষ সংখ্যা ২০২০) নাম্বারে পাঠানো হয়।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রায় দুই মাস আগে এই জাফরকেই আশুলিয়ার ভাদাইল এলাকার শমসের প্লাজার সামনে থেকে ২০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হাশেম প্লাজার সামনের ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে এই পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়।
শুধু আশুলিয়ার কাইচাবাড়ি ও নিশ্চিন্তপুরের ঘটনাই নয়, আমিনবাজার, কাউন্দিয়া এবং শ্রীপুর এলাকায়ও একই কায়দায় আটক বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এলাকাভিত্তিক সোর্স নিয়োগ দিয়ে মাদক কারবারিদের আটক করা এবং পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া যেন এই দলটির প্রধান কাজ।
বিশ্বস্ত সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর আমিনবাজার বরদেশী এলাকা থেকে ‘হাতকাটা’ নামের এক কারবারিকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাত্র ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
গত ৭ আগস্ট আমিনবাজার এলাকায় জাহি ও তার ছেলে আগুনকে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ আটক করে। তবে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে মাত্র ১০০ পিস ইয়াবা দেখিয়ে (জাহিকে ১০ ও আগুনকে ৯০ পিস) মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এই পুরো বিষয়টি আমিনবাজারের একটি হোটেলের মালিক ও স্থানীয় মেম্বারের মধ্যস্থতায় মীমাংসা করা হয়। তবে উদ্ধার হওয়া হেরোইন এখন কার হেফাজতে রয়েছে তার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, সাভারের আমিনবাজারে এসবি পুলিশ সদস্য হত্যার মাত্র দুই দিন পর (৮ সেপ্টেম্বর) কাউন্দিয়া এলাকায় সোর্স সোহেলের মাধ্যমে মাদক কারবারি শিখার বাবা ও মাকে ১০০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে তারা। পরে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
বলছে, গত ৪ আগস্ট সাভারের মজিতপুরে জাহাঙ্গীর ও তার ভাইকে ৩৫০ পিস ইয়াবাসহ ধরে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয় এসআই মতিউর ও তার টিম। পাশাপাশি আশুলিয়ার শ্রীপুরের সুবন্ধী এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী সুলতানের স্ত্রী ও ছেলেকে ২৫ গ্রাম হেরোইনসহ ধরে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া এবং ভাদাইলে সোর্স পরিচয় দানকারী এক ব্যক্তির মাধ্যমে মাদক কারবারি সুজনকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ আটকের পর ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এসআই মতিউরের নেতৃত্বাধীন টিমের বিরুদ্ধে। এ সময় মাদক কারবারি সুজনের সাথে আটক নাজমুল ও আনোয়ারকেও টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এসআই মতিউর ও এএসআই মেহেদী। এর মধ্যে এএসআই মেহেদী ঢাকা জেলা (উত্তর) ডিবিতে দীর্ঘ ৪ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন। একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে এলাকায় তিনি নিজস্ব একটি শক্তিশালী সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। মূলত এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই দিনের পর দিন এমন অপেশাদার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ডিবি পুলিশের এসআই মতিউর রহমানের সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি এনপিবি নিউজকে বলেন, এসব বিষয় নিয়েতো ভাই আমাগোতো একবারে অর্ধেক মাইরা ফেলছে। এগুলোতো মিথ্যা। মামলা বারাই দিয়েছি, কমাই দিয়েছি, কেউ মামলা দিলে টাকা দেয় বলেন। তাহলে আপনাকে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, না না এ একটা বিষয় নিয়েই সাবার মোটামুটি আমায় ফোন দিয়েছে, তাদের সাথেও কথা বলছি, বলিনাই যে তা না, চা টা খাইছি আরকি। সমস্যা নাই আপনি ফোন দিয়েছেন, দেখা করবো আপনার সাথে।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা (উত্তর) ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসে নাই। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) জাহিদুল ইসলাম খানের মন্তব্য জানতে তাদের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তাদের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তাদের নম্বরে ক্ষুদেবার্তা (এসএমএস) পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
তবে এই সংবাদটি প্রকাশ করার ৫ ঘন্টার ভিতরে( NPB) নামক সংবাদ মাধ্যমেটির সাইট থেকে প্রকাশিত সংবাদটি মুছে ফেলা হয়। সংবাদ প্রকাশের পর এতো দ্রুত কেন মুছে ফেলা হলো তা নিয়ে কোন ব্যাখ্যা দেননি (NPB) সংবাদ মাধ্যম। তাহলে কি মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এমন তথ্য বহুল আলোচিত একটি প্রকাশিত সংবাদ মুছে ফেলেছেন? নাকি কোন উপর মহলের চাপে তা মুছে ফেলেছেন। নাকি প্রকাশিত সংবাদটি মিথ্যা ছিলো? এমন হাজারো প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
অন্যদিকে এমন সংবাদ প্রকাশের পরও অভিযুক্ত দুই ডিবি সদস্যের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোন ব্যবস্থা নেননি বলে গেছে। তবে কি ঘুষ বানিজ্যের ৩৮ লাখ টাকার ভাগ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বড় বাবুদের পকেটেও পৌঁছেছে? এই প্রশ্ন এখন উড়ে বেড়াচ্ছে সাভার আশুলিয়ার আকাশে বাতাসে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এসআই মতিউর রহমান ও এএসআই মেহেদী হাসান এর সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে সাভার (ডিবি) ঢাকা জেলা উত্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্নকর্তা (ওসি) সাইদুল ইসলাম বলেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে আমি সেটা দেখেছি, তবে এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না তারপরও আমরা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবো।



