ইসলাম ধর্ম

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি হযরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)-এর অনুপম ত্যাগের ইতিহাস

ইসলামিক ইতিহাস: ইসলামের ইতিহাসে যেসব সাহাবি নিজ বীরত্ব, ত্যাগতিতিক্ষা এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত অনুকরণীয় এক নাম হজরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)। তিনি ছিলেন মহানবী (সা.)-এর ফুফাতো ভাই এবং দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সৌভাগ্যবান দশ সাহাবির (আশারায়ে মুবাশশারা) অন্যতম। তাঁর অনন্য বীরত্ব ও নিবেদিত মানসিকতার জন্য নবীজী (সা.) নিজে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “প্রত্যেক নবীরই হাওয়ারী (বিশেষ সাহায্যকারী) ছিল, আর আমার হাওয়ারী হলো যুবায়ের।” (সহিহ বুখারি)।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন যুবায়ের (রা.)। মক্কী জীবনের সূচনালগ্নে একদিন হঠাৎ রটে যায় যে, কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বন্দি বা শহীদ করেছে। এই সংবাদ শোনামাত্রই কিশোর যুবায়ের খাপমুক্ত তরবারি হাতে মক্কার অলিগলিতে প্রিয় নবীজির সন্ধানে ছুটে যান।

নবীজী (সা.) তাঁকে সশস্ত্র অবস্থায় দেখে কারণ জানতে চাইলে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, কেউ যদি মহানবী (সা.)-এর সামান্যতম ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তবে তিনি এই তরবারি দিয়ে তার বিচার করবেন। কিশোর যুবায়েরের এই অসম সাহসিকতায় খুশি হয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাঁর এবং তাঁর তরবারির জন্য বিশেষ দোয়া করেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনিই ইসলামের প্রথম ব্যক্তি যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তরবারি উন্মুক্ত করেছিলেন।

ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর আপন চাচা নওফেল ইবনে খুওয়াইলিদ সত্যের পথ থেকে তাঁকে ফেরাতে অমানবিক নির্যাতন চালায়। চট বা মাদুরের ভেতরে শক্ত করে বেঁধে রেখে নিচে তীব্র ধোঁয়া সৃষ্টি করা হতো, যাতে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে।

চাচা শর্ত দিত, মুহাম্মাদ (সা.)-এর দ্বীন ত্যাগ করলেই কেবল মুক্তি মিলবে। তবে ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেও কিশোর যুবায়ের দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিতেন, “আমি কখনোই কুফরে ফিরে যাব না।” কোনো শারীরিক নির্যাতনই তাঁর ইমানের ভিত নাড়াতে পারেনি।

  • উহুদের প্রান্তর: উহুদের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর চরম সংকটকালে, যখন কাফেররা মহানবী (সা.)-কে ঘিরে ফেলেছিল, তখন যুবায়ের (রা.) নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে নবীজীকে রক্ষা করেন। যুদ্ধশেষে তাঁর শরীরে এত গভীর ও অজস্র আঘাতের ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছিল যে, তা দেখতে গর্তের মতো মনে হতো।
  • ইয়ারমুকের রণক্ষেত্র: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরও তাঁর বীরত্বগাথা থামেনি। ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমানদের বিশাল বাহিনীর সামনে একক সাহসিকতায় ঘোড়া ছুটিয়ে রোমান ব্যূহ ভেদ করে অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে যান তিনি। তাঁর এই অভাবনীয় বীরত্ব রোমান বাহিনীর মনোবল চুরমার করে দিয়েছিল।

হজরত যুবায়ের (রা.) কেবল একজন বীর সেনানীই ছিলেন না, বরং একাধারে একজন সফল ব্যবসায়ী এবং মানবসেবক ছিলেন। আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করাই ছিল তাঁর জীবনের পরম আকাঙ্ক্ষা।

তাঁর অবিচল ইমান, কুরবানি এবং জীবনদর্শন বর্তমান সময়ের প্রতিটি বিশ্বাসী মানুষের জন্য এক মহান অনুপ্রেরণা। বস্তুত, পার্থিব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য ও হকের ওপর অবিচল থাকার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা চিরকাল মুমিন হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যাবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button