আইন ও বিচার

পুলিশের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির দুই মামলায় রকি বগাসহ ১৩ জন কারাগারে

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: খুলশীতে পুলিশের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে করা দুই মামলায় ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা রকিসহ ১৩ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এজিএম মনিরুল হাসান সরকারের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। পরে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্তদের কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় এলাকায় স্বস্তি ফিরে এসেছে বলে দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের করা দুটি মামলায় আলোচিত ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা রকিসহ ১৩ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় খুলশী ও আশপাশের এলাকায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, দখলবাজি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।

গতকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এজিএম মনিরুল হাসান সরকারের আদালতে শুনানি শেষে তাঁদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। খুলশী থানার জেনারেল রেজিস্টার অফিসার (জিআরও) উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালত ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, মামলার প্রধান আসামি ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা অন্য একটি মামলায় আগে থেকেই কারাগারে ছিলেন। মঙ্গলবার প্রোডাকশন ওয়ারেন্টের (পি/ডব্লিউ) মাধ্যমে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। অন্যদিকে, হাইকোর্ট থেকে পাওয়া ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় অপর ১২ আসামি নির্ধারিত দিনে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত ১৩ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

কারাগারে পাঠানো অন্য আসামিরা হলেন—রকি হোসেন ওরফে পিচ্চি, মনির হোসেন ইমন, শাকিল, আবুল হাসান ওরফে কালা হাসান, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রহমান, নওশাদ, সোহেল ওরফে ব্লেড সোহেল, আবুল কাশেম ওরফে আবু কাশেম, রবিন হোসেন, সাকিব হাসান ও দেলোয়ার হোসেন জিসান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারাগারে থাকায় বর্তমানে খুলশীর সংশ্লিষ্ট এলাকায় আগের তুলনায় পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তাঁদের দাবি, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারাগারে থাকায় সাধারণ মানুষ আপাতত কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, মামলার আসামিরা জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে এলে আবারও চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, চুরি, জমি ও স্থাপনা দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁদের এ আশঙ্কার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
স্থানীয়দের মতে, কোনো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি শুধু গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। অপরাধের অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত, মামলার সুষ্ঠু বিচার, অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত পুলিশি টহল এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে কেন্দ্র করে এলাকায় একটি প্রভাবশালী অপরাধী চক্রের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের দাবি, এই চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার, জবরদখল ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা আরও দাবি করেন, বিভিন্ন অপরাধের আশঙ্কায় তাঁরা অনেক সময় প্রকাশ্যে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে তা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।

স্থানীয়দের বক্তব্য, অপরাধের অভিযোগে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অনুসন্ধান ও নজরদারি প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রকির বিরুদ্ধে অস্ত্র মজুতের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
অভিযুক্তদের মধ্যে রকি হোসেন ওরফে পিচ্চিকে নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা অভিযোগের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যক্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক কর্মীর দাবি, রকির কাছে দেশীয় অস্ত্রের মজুত রয়েছে। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান। ওই ব্যক্তির অভিযোগ, রকি ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং তাঁর ভাই। স্থানীয়ভাবে তাঁকে বগার অন্যতম সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। তবে রকির কাছে অস্ত্র থাকার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যও এখানে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, অভিযোগটি সত্য হলে দ্রুত তদন্ত করে অস্ত্রের অবস্থান শনাক্ত এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বা মজুতের আশঙ্কা থাকলে তা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। এ কারণে অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ অনুসন্ধান ও আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
‘এখন এলাকা শান্ত, আসামিরা ফিরলে পরিস্থিতি বদলানোর আশঙ্কা’ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা কারাগারে থাকায় বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত বলে তাঁদের মনে হচ্ছে। তবে তাঁরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এলাকায় ফিরে এলে আগের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হলে অপরাধের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু নির্দিষ্ট কোনো মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোই যথেষ্ট নয়; বরং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁরা আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাতে না পারে, সে জন্য পুলিশের নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার ও জবরদখলের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তাঁরা।

এলাকার সচেতন নাগরিকদের কয়েকজন মনে করেন, অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত পুলিশি টহল, অভিযোগ গ্রহণে সহজ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা দাবি করেন, কোনো অপরাধী চক্র যাতে কারাগার থেকে বেরিয়ে আবারও এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। কয়েকজন বাসিন্দা আরও বলেন, অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি ছাড়াই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অভিযোগকারীদের পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষা করা গেলে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ এবং অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ আরও কার্যকর হতে পারে। পুলিশের বক্তব্য ও মামলার পরবর্তী কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ খুলশী থানার জিআরও এসআই নুরুল আলম ১৩ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে উত্থাপিত অস্ত্র মজুত, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও জবরদখলের অভিযোগ সম্পর্কে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে, পুলিশের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে করা দুই মামলায় বগাসহ ১৩ জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুলশী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, মামলাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এলাকায় অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button