বিশেষ প্রতিবেদন

পুলিশের প্রতি হিংসা-অপসংবাদিকতার বলি অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির (পর্ব- ১)

বিশেষ প্রতিবেদক: সেদিন কি ঘটেছিল পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে? প্রথম সারির প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্বহীন প্রতিবেদন দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়ালো। থমকে তো যাবারই কথা, যেই মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে সরকারের মুক্তিযোদ্ধা প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন (এমপি) মন্ত্রিত্ব হারালেন, সেই মাদক ও বারের আস্তানা হয় যদি একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায়! খিলক্ষেত থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় অবস্থিত, পুলিশ সদর দপ্তরের (রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের বাসভবনে সম্প্রতি অভিযান চালায় ডিবি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ডিবি পুলিশের অভিযানে বাড়িটি থেকে তিনটি মদের বোতল, ইয়াবাসহ ‘কুশ’ নামের একটি বিশেষ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে যৌনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করার কথা জানান ডিবির উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির।

অভিযোগ উঠেছে, অনেক গণমাধ্যম আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ শিরোনাম ব্যবহার করে ভুয়া দৃশ্য ধারণের আশ্রয় নিয়েছে। সংবাদের সঙ্গে ক্যাসিনো, বার ও বিভিন্ন মাদকের পুরনো বা অনলাইন ভিডিও যুক্ত করে কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়েছে, যার সঙ্গে ঘটনাস্থলের প্রকৃত চিত্রের কোনো মিল নেই।

‘অপরাধ বিচিত্রা’র অনুসন্ধানে জানা যায়, অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের বাড়িটি মূলত বেশিরভাগ সময় খালিই থাকে এবং সেখানে মাদকসেবনের কোনো স্থায়ী সরঞ্জাম বা পরিবেশ ছিল না। এমনকি জন্মদিন বা গায়েহলুদসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য সাউন্ড সিস্টেম থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী আয়োজকদেরই বাইরে থেকে ভাড়া করে আনতে হতো।

পার্টির অতিথিদের আপ্যায়নসামগ্রী বাইরে থেকেই নিয়ে আসতে হয়। তবে সুবিধার্থে রান্নার ব্যবস্থা থাকায় কেউ কেউ নিজ দায়িত্বে রান্না করে অতিথিদের আপ্যায়ন করেন।

অভিযোগ উঠে যে, প্রথম সারির অনেক গণমাধ্যম সরেজমিনে তদন্ত বা তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই কেবল ডিবির সংবাদ সম্মেলনের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন করেছে। কোনো কোনো গণমাধ্যমে আটকের সংখ্যা ৮৪, আবার কোথাও ৮৫ জন উল্লেখ করা হয়।

সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো, ঘটনাস্থল খিলক্ষেত থানা এলাকায় হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ গণমাধ্যমের শিরোনামে ভাটারা থানার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ভাটারা থানা কর্তৃপক্ষ ‘অপরাধ বিচিত্রা’কে জানান, ‘আলোচিত এই ঘটনাটি খিলক্ষেত থানা এলাকায় ঘটেছে। অথচ তা সত্ত্বেও আমাদের ভাটারা থানার নাম জড়িয়ে গণমাধ্যমগুলো কেন সংবাদ প্রকাশ করল, তা বোধগম্য নয়’

এমনকি মূলধারার অন্যতম শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ‘সময় টিভি’ এই অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিয়ে একটি ইতিবাচক ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে তা সরিয়ে নেয় বা ডিলিট করে দেয়।

‘অপরাধ বিচিত্রা’র অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘এয়ারবিএনবি’ হলো একটি বৈশ্বিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা প্ল্যাটফর্ম; যার মাধ্যমে বাড়ির মালিকেরা তাঁদের বাসা, অ্যাপার্টমেন্ট বা কক্ষ স্বল্পমেয়াদে (যেমন: জন্মদিন, গায়েহলুদ, ঘরোয়া অনুষ্ঠান বা পর্যটকদের জন্য) ভাড়া দিয়ে থাকেন। আলোচিত বাড়িটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৫টি কক্ষ রয়েছে। অ্যাপস পরিচালনার পাশাপাশি বাড়িটি দেখভালের জন্য একজন বেতনভুক্ত ম্যানেজার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য একজন ক্লিনার নিয়োজিত আছেন, যিনি সার্বক্ষণিক ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন। কিন্তু ঘটনার দিন ডিবি পুলিশ ক্লিনারকে রেখে কেবল ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, গত ২০ অক্টোবর দুপুর ১টা থেকে ভোর পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন ডিবি সদস্য অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৫ থেকে ৭ জন সদস্য উশৃঙ্খল আচরণ করেন এবং একজন শারীরিক গঠনগতভাবে স্থূল ডিবি সদস্য সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে ফেলেন। এ ছাড়া, ওই অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের দুটি গাড়ি জব্দ করা হয় (যা বর্তমানে খিলক্ষেত ও মিরপুর থানা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে)। জব্দকৃত গাড়িগুলোর একটির সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে জানা যায়।

অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির ‘অপরাধ বিচিত্রা’কে জানান, পুলিশ বাহিনীর চাকরির ব্যস্ততার কারণে বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া বা দেখভাল করার সুযোগ আমার হয় না। এমনকি সেখানে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসও করা হয় না। তাই বেতনভুক্ত ম্যানেজার নিয়োগ করে তাকে এয়ারবিএনবি অ্যাপসের সুপ্রিম অথরিটি দিয়ে বাড়িটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, আমার বাড়িতে যেকোনো ধরনের অসামাজিক, অনৈতিক বা অবৈধ কার্যকলাপ এবং মাদকদ্রব্য বা ইয়াবা সেবন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার চুক্তির ৩ নম্বর শর্তে এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি শর্ত লঙ্ঘন করলে ৮০০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১ লাখ টাকা) জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

ডিআইজি বলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা, অবৈধ কার্যকলাপ বা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ কিছু ঘটলে ম্যানেজার চাইলে তখনই বাড়ি ভাড়া বাতিল করতে পারতেন। এ ঘটনায় ম্যানেজার বা কো-হোস্টের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। নিয়ম মেনে রুম ভাড়া নেওয়ার পর যদি কেউ মাদক বা নিষিদ্ধ জিনিসপত্র নিয়ে প্রবেশ করে, তবে এর সম্পূর্ণ দায়ভার আয়োজক ও ভাড়াটিয়াকেই বহন করতে হবে। বাড়ির মালিকের ওপর এর দায় চাপানো অযৌক্তিক। প্রচলিত আইন অমান্য করে বাসার নিয়ম ভঙ্গ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য ভাড়াটিয়া ও অংশগ্রহণকারীপক্ষই দায়ী থাকবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) গত ২০ অক্টোবর (সোমবার) রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত পুলিশ হাউজিং-১-এর একটি ভবনে মাদকবিরোধী অভিযান চালায়। একটি ডিজে পার্টির আয়োজনে পরিচালিত ওই অভিযানে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষসহ মোট ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত ডিআইজিকে নিজ কর্মস্থল থেকে ঢাকা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সংযুক্ত করা হয়।

পরের দিন, ২১ অক্টোবর ডিবির উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করলে ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে ‘অপরাধ বিচিত্রা’র একটি অনুসন্ধানী দল কাজ শুরু করে।

সংবাদ সম্মেলনে ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, গ্রেপ্তারকৃত ৮৪ জনকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষদের ১ মাসের কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অতিরিক্ত ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে, নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অতিরিক্ত ৩ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের কেউ গোপনে মাদকদ্রব্য এনে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব ডিবি পুলিশের। তবে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন করাই ‘অপরাধ বিচিত্রা’র নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য। অপরদিকে, অভিযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির জানান যে তিনি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সরকারের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button