ইসলাম ধর্ম

তাওহিদের অবিচলতা, ঈমানের পরীক্ষা এবং আত্মত্যাগের অনুপম ইতিকথা

ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: পবিত্র কুরআনের সুরা আল-বুরুজে ইশারা করা এবং হাদিসে রাসুল (সা.)-এর মাধ্যমে বর্ণিত ‘আসহাবে উখদুদ’ বা গর্তওয়ালাদের মর্মান্তিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে তাওহিদ ও ঈমানের শক্তির এক অনন্য নিদর্শন। কীভাবে একজন কিশোরের অটল বিশ্বাস পুরো জাতির অন্তরে ঈমানের আলো জ্বেলে দিয়েছিল এবং মুমিনরা কীভাবে পার্থিব জীবনের মোহ ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, এই ঘটনায় তার মূর্ত প্রতীক ফুটে উঠেছে।

১. কিশোরের সত্যের সন্ধান ও তাওহিদ লাভ

পুরাকালে এক অত্যাচারী রাজার অধীনে একজন প্রবীণ জাদুকর ছিল। মৃত্যুর আগে সে তার বিদ্যা শেখানোর জন্য রাজাকে এক বুদ্ধিমান কিশোর নির্বাচন করতে বলে। কিশোরটি যাদু শেখার জন্য যাতায়াতের পথে এক আল্লাহভীরু সন্ন্যাসী বা রাহিবের সংস্পর্শে আসে। সেই রাহিব তাকে একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহিদের দাওয়াত দেন। ধীরে ধীরে কিশোরের হৃদয়ে জাদুকরি ক্ষমতার মোহ কেটে গিয়ে এই বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, সমস্ত ক্ষমতা ও আরোগ্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।

২. আল্লাহর কুদরত ও অলৌকিক নিদর্শন

সত্যের পথে অবিচল থাকার পর আল্লাহ তাআলা সেই কিশোরের হাতে নানা অলৌকিক ক্ষমতা ও দোয়া কবুলের বরকত দান করেন। তার দোয়ায় জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টি ফিরে পেত এবং কুষ্ঠরোগীসহ বিভিন্ন রোগী সুস্থ হয়ে উঠত। সে সব সময় বলত, “আমি কাউকে সুস্থ করি না, সুস্থ করেন একমাত্র আল্লাহ।”

যখন রাজার কানে এই খবর পৌঁছাল, তখন সে ক্ষুব্ধ হয়ে কিশোরকে হত্যার বিভিন্ন ফন্দি আঁটল। পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দেওয়া কিংবা সমুদ্রে নৌকা ডুবিয়ে হত্যার বহু চেষ্টা করেও রাজন্যবর্গ ব্যর্থ হয়। কারণ প্রতিবারই কিশোরের দোয়ায় আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন এবং শত্রুরা নিজেরাই ধ্বংস হয়ে যায়।

৩. আত্মত্যাগের মাধ্যমে তাওহিদের বিজয়

অবশেষে কিশোর নিজেই রাজাকে তার মৃত্যুর উপায় বলে দিল। সে বলল, সব মানুষকে এক জায়গায় একত্র করো, আমাকে গাছের সাথে বেঁধে আমারই তূণ থেকে একটি তীর নিয়ে ‘বিসমিল্লাহ, এই কিশোরের রবের নামে’ বলে নিক্ষেপ করো। রাজা জনসমক্ষে ঠিক তাই করল। তীরটি কিশোরের কপালে লাগার সাথে সাথে সে শাহাদাত বরণ করল।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দৃশ্য দেখার সাথে সাথে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে বলে উঠল, “আমরা এই কিশোরের রবের ওপর ঈমান আনলাম!” একজন মানুষের নিখাদ আত্মত্যাগ চোখের পলকে পুরো জাতির হৃদয়ে তাওহিদের আগুন প্রজ্বলিত করে দিল।

৪. অগ্নিকুণ্ডের পরীক্ষা ও মায়ের ঈমান

এতে রাজা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বিরাট বড় বড় খাদ খনন করল এবং সেগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে ঘোষণা দিল—যে ঈমান ত্যাগ করবে না, তাকে এই আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। মুমিনরা হাসিমুখে সেই আগুনে ঝাঁপ দিল কিন্তু বিন্দুমাত্র ঈমান ত্যাগ করল না।

এর মধ্যে এক নারী তার কোলের দুধের শিশুকে নিয়ে আগুনে পড়ার মুহূর্তে সামান্য দ্বিধায় পড়লে, আল্লাহর কুদরতে সেই শিশুটি কথা বলে ওঠে এবং বলে— “হে মা! ধৈর্য ধরুন, আপনি সত্যের ওপর আছেন।” এরপর সেই মা তার সন্তানসহ হাসিমুখে আগুনে প্রবেশ করেন।

পবিত্র কুরআনের সুরা বুরুজে এই সম্পর্কে বলা হয়েছে:

“ধ্বংস হোক খাদের অধিবাসীরা। জ্বালানিভর্তি অগ্নিকুণ্ডের অধিকারীরা। তারা আগুনের পাশে বসেছিল এবং মুমিনদের প্রতি যা করছিল তা প্রত্যক্ষ করছিল। তারা মুমিনদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছিল কেবল এ কারণে যে, তারা পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিত আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিল।” (সুরা আল-বুরুজ: ৪-৮)

এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্যের পথে অবিচল থাকা, তাওহিদের ওপর শক্তভাবে টিকে থাকা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা মুমিনের সবচেয়ে বড় পুঁজি। পার্থিব জীবন ও ক্ষমতার লোভ বা মৃত্যুর ভয় একজন খাঁটি মুমিনকে তার রব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ঐতিহাসিক ঘটনার শিক্ষা গ্রহণ করার এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাওহিদের ওপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button