আত্বহত্যার প্রবণতা রোধে পদক্ষেপ নেয়া হোক

0
553

সাহেনা আক্তার হেনা
সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে আজ আতœহত্যা একটি মারাতœক গুপ্তঘাতক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ঠুনকো ব্যাপারেও কেউ-কেউ আতœহননের পথ বেছে নিচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বলা চলে শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বে আতœহত্যা একটি ভয়ংকর ব্যাধি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি অন্যতম প্রধান কারণ হলো আতœহত্যা। বিশ্বসাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ি বাংলাদেশের আতœহত্যার পরিস্থিতি ভয়াবহ। আতœহত্যার অপর এক নাম সুসাইড। ‘সুই’ মানে নিজে, ‘সাইড’ মানে হত্যা। আতœহত্যা বলতে বুঝায় স্বেচ্ছায় নিজের জীবন কেড়ে নেয়া। ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আতœহত্যা প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি সারাবিশ্বে পালিত হলেও সারাবছর এ নিয়ে অঅর কোন রাঁ থাকে না। ফলে বেড়েই চলেছে আতœহত্যার প্রবণতা। বিশ্বসাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ি, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে আতœহত্যা করে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। আতœহত্যা প্রবণ এবং আতœহত্যার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় প্রায় ১৫-২০ গুন মানুষ। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতিরিক্ত আতœহত্যার হার একটি বোঝা স্বরুপ। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে প্রায় ৭ দশমিক ৮ জন আতœহত্যা করে। এরমধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যাই বেশী। বাংলাদেশ, চীনসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিবাহিত নারী, তরুণ-তরুনীদের মধ্যে আতœহত্যা প্রবণতার হার বেশী। আতœহত্যা মানে কেবল ওই ব্যক্তির জীবনাবসানই নয়। পরিবার ও সমাজে এর এক ধরনের সূদুর প্রসারী বিরুপ মানসিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া থেকেই যায়। মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশে প্রতিবছর অনেক মানুষ আতœহত্যা করলেও এ নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এমনকি আতœহত্যা প্রবণতা আছে এমন কারোর চিকিৎসা ব্যবস্থাও অপ্রতুল। বাংলাদেশে বেশীরভাগ মানুষ আতœহত্যা করে গলায় ফাঁস দিয়ে। দড়ি, ওড়না, বিষ, কীটনাশক, মাত্রাতিরিক্ত ঔষধ সেবন, মারাতœক প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, অতিরিক্ত মদ বা নেশা জাতীয় পদার্থ গ্রহণ, বাস-ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দেয়া, পুকুরে বা নদীতে ঝাঁপ দেয়া, নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে, বিল্ডিংয়ের ছাদ বা অতি উচুঁ কোন জায়গা থেকে লাফ দেয়াসহ বিভিন্নভাবে আতœহত্যা করা হয়। প্রত্যেক ধর্মে আতœহত্যা মহাপাপ। ইসলামের দৃষ্টিতে আতœহত্যার পরিণতি জাহান্নাম। আতœহননকৃত ব্যক্তির নামাজে জানাযার ব্যাপারেও বিধি-নিষেধ রয়েছে। ইসলাম ধর্মে তাদের জানাযা পড়ার ব্যাপারেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। যাতে কেউ আতœহত্যার প্রতি আকৃষ্ট না হয়। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআন-এ বলেছেন, “আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, অবশ্যই আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করব। আমার পক্ষে তা সহজসাধ্য”। (সূরা-আল নিসা, আয়াত-২৯-৩০)। ধর্মীয় দৃষ্টিতে আতœহত্যা সম্পর্কে বিশ্লেষন, আরো দেখা যায়, আনাস (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা:) বলেন, “দুঃখ-কষ্টে পতিত হওয়ার ফলে কেউ যেন মৃত্যুকে কামনা না করে। একান্ত যদি তা করতে হয় তবে সে যেন বলে আল্লাহ জীবন আমার যতক্ষণ কল্যাণকর ততক্ষণ আমাকে জীবিত রাখো, আর মৃত্যু যখন আমার জন্য কল্যাণকর তখন আমাকে মৃত্যু দান করো”। মোটকথা ইসলামে আতœহত্য তো দূরের কথা মৃত্যু কামনা করাও জায়েজ নেই। হিন্দু ধর্মে ও বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থেও আতœহত্যাকারীদের স্থান নরকে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থেও আতœহত্যাকে প্রতিরোধের জন্য একই কথা বলা হয়েছে। যদিও মানসিক রোগ সমূহ মুড ডিসঅর্ডার, বিশেষত মারাতœক বিষন্নতা, মদ আসক্তি/অপব্যবহার, মাদকাসক্তি/অপব্যবহার, প্রান্তিক ব্যক্তিত্বের সমস্যা, সিজোফ্রেনিয়া/উম্মাদনা, বার্ধক্য, দুরারোগ্য শারিরীক ব্যাধি, বেকারত্ব, দারিদ্র, খিচুনিরোগ, সম্পর্কের জটিলতা, বিবাহ বিচ্ছেদ, পরিবারে পূর্বে কারো আতœহত্যার চেষ্টা, মানসিক আঘাত বা কষ্ট, খুব প্রিয় কারো মৃত্যু। এমনকি যৌতুক, পারিবারিক কলহ, অবহেলা, নির্যাতন, প্রেম/বিবাহ বহির্ভূত
সম্পর্ক, উত্যক্ততা ও প্ররোচিত আতœহত্যা, গর্ভধারণ, লোকলজ্জার ভয়, নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিচ্যুতি ইত্যাদী কারণে অনেকে আতœহত্যা করে থাকে। তদুপরি আতœহনন বা আতœহত্যা মহাপাপ এবং আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দন্ডবিধি আইনে অপরকে খুন করা এবং নিজেকে খুন করা (আতœহত্যা) ইভয়ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গন্য করা হয়। দন্ডবিধি ৩০৯ ধারা মতে, যে ব্যক্তি আতœহত্যা করার উদ্যোগ করে এবং অনুরুপ অপরাধ করার উদ্দেশ্যে কোন কাজ করে, সে ব্যক্তি বিনাশ্রমে কারাদন্ড ভোগ করবে যাহার মেয়াদ ১ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদন্ড বা উভয়বিধি দন্ডে দন্ডিত হবে। আতœহত্যার চেষ্টা বা আতœহত্যার প্রবণতা একটি মানসিক ব্যাধি। যা পুরোপুরি নিরাময় যোগ্য। জীবন চলার পথে জীবনের প্রতিটি বাঁকে-বাঁকে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সংগ্রাম এবং সাফল্য নিয়েই আমাদের পথ চলতে হয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও সমস্যা সমাধানের বাস্তবতায় হতে হয় আমাদের অবধারিত মুখোমুখি। তাই বলে জীবন থেমে যায় না। জীবন চলার পথে কারণে-অকারণে তৈরী হওয়া ঘাত-প্রতিঘাতের ক্ষণে একমাত্র সমাধান আতœহত্যা কোনভাবেই হতে পারে না। “কাঁটা হেরি শান্ত কেন কমল তুলিতে, দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহীতে”? জীবনের অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছঁতে হলে, দুঃখ কষ্টের অসত্য যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়। দুঃখ ব্যতিত সুখ লাভ করা যায় না। মানুষের জীবন কর্মময়। পৃথিবীর যে কোন কাজই পরিশ্রম সাধ্য। দুঃখ কষ্ট সহ্য করে নিজের কাজে অভিষ্ট থাকলে কর্মে সফল হওয়া যায়। তাইতো মণীষিরা বলেছেন-এ পৃথিবী অলস কর্ম ভীরুদের জন্য নয়। ক্ষুরের ধারের মতো নিশীত রাত্রির নিশ্চিদ্র অন্ধকারের মতো দুঃখ-দুর্যোগময় এই জীবনের পথ। আমাদের মনে রাখতে হবে আজকে যা অসম্ভব আগামীতে তা সম্ভব হয়ে উঠবেই। আজ অন্ধকারে যা অস্পষ্ট কাল দিবালোকে তা পরিস্কার হয়ে যাবে। অতি বিভীষিকাময় মুহূর্তেও আমাদের ধৈর্য ধরে অন্ধকার জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া উচিৎ হতে হবে। তাহলে সমাধান এবং সাফল্য আসবেই। তাই আমরা মনে করি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও পরিবারে আতœহত্যার কুফল ও ভয়াবহতা এবং আতœহত্যা প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক নানা সভা-সেমিনার চালুর মাধ্যমে আতœহত্যা প্রবণ মনোভাবের ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে তাদের মানসিকভাবে সহযোগীতা বা অবলম্বন দেয়ার জন্য প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে এবং বুঝাতে হবে জীবনের চেয়ে কোন কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। একইসাথে সিনেমা-নাটক, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় জীবন সম্পর্কে সচেতন হওয়া ও আতœহত্যার কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে পারলে, তবেই আতœহত্যা প্রবণতা অনেকটা কমে আসবে। এটি এখন সময়ের দাবী। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলও আতœহত্যার প্রবণতা রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, এমনটা প্রত্যাশা আমাদের।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here