উন্নয়ন ও দুর্নীতি

0
988

উন্নয়ন, উন্নয়ন আর উন্নয়ন! সরকার উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিচ্ছে। সরকারের এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা আর নেতা-নেত্রীদের মুখে উন্নয়নের কথা শুনতে শুনতে দেশবাসী অতিষ্ঠ। দেশবাসী যেমন উন্নয়ন চায়, তেমনি উন্নয়নের নামে চুরি, পুকুর চুরি এবং সাগর চুরি হোক তা চায় না। হ্যাঁ, উন্নয়ন যে হয়নি তা বললে মিথ্যা কথা বলা হবে এবং ধর্মীয়ভাবে মিথ্যা কথা বলাটা পাপ। তবে সত্য কথা বলতে গিয়ে বলতে হচ্ছে- উন্নয়নের নামে বরাদ্দওতো বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার ১৯৭২-৭৩ সালে৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিল। সর্বশেষ বাজেট ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ৪ লক্ষ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষিত হয়। প্রতি বছর পর্যায়ক্রমে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে উন্নয়নতো বৃদ্ধি পাবে এবং তাই-ই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে দেশবাসীর প্রশ্ন হলো- বরাদ্দকৃত অর্থের কতো টাকা কোন খাতে খরচ হচ্ছে এবং এর কত টাকার কাজ হচ্ছে এবং আর কত টাকা চুরি হচ্ছে? দুর্নীতির হার যে বৃদ্ধি পেয়েছে তা কিন্তু সরকারের কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলছে না। এ দুর্নীতি বা চুরির সাথে যেমন জড়িত ছিল পূর্বের সরকারগুলো, তেমনিভাবে দুর্নীতি বা চুরি করছে বর্তমান সরকারের ছত্র-ছায়ায় তাদের লোকজন। পূর্বের সরকারও চুরি করেছে, দুর্নীতি করেছে আর বর্তমান সরকার ও দুর্নীতি করছে, তাহলে তফাৎ কি….?
সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে দেশবাসীর প্রশ্ন- আপনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী ওয়াদা করেছিলেন দুর্নীতিবাজদের বিচারের ব্যাপারে। আপনার নির্বাচনী ওয়াদায় ছিল- নির্বাচনে জয়লাভ করলে এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টাসহ ক্ষমতাসীনদের অর্থ ও সম্পদের হিসাব জনসম্মুক্ষে প্রকাশ করবেন। এতোটি বছর চলে গেলেও আপনার সরকার এই হিসেব দেয়া থেকে বিরত আছেন কেন? আপনি কি জানেন যে, দেশে ফ্রি-স্টাইলে দুর্নীতি চলছে! নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ বা বাস্তবায়ন না করার কারণটা দেশবাসী জানতে চায়। আপনি কি বলতে পারেন যে, বর্তমান জাতীয় সংসদের এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা নেতা-নেত্রীরা দুর্নীতিমুক্ত? যদি সাহস থাকে তাহলে এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা ক্ষমতাসীনদের অর্থ-সম্পদের হিসেব জনসম্মুখে প্রকাশ করুন। অথবা প্রমাণ করুন- আপনার এমপি, মন্ত্রী বা নেতা-নেত্রীরা দুর্নীতিবাজ নয়।
দুর্নীতি যে বাড়ছে এবং দুর্নীতিবাজদের হার যে তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে তা দুদকের চেয়ারম্যানের কথায় প্রমাণিত। দুর্নীতি রাজধানী হতে জেলা, জেলা হতে উপজেলা এবং উপজেলা হতে ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। এ মরণব্যাধি রুখতে না পারলে আমাদের জাতি অতর গহ্বরে পতিত হবে এবং সেখান থেকে আর উত্তোলনের কোন পথ হয়তো থাকবে না।
উদাহরণ হিসেবে আপনার দলের একজন সাংসদ বি এইচ হারুন (ঝালকাঠির কাঠালিয়া-রাজাপুর নির্বাচনী এলাকা) নির্বাচনের পূর্বে মাত্র ৩৮ লাখ টাকার অর্থ-সম্পদের হিসেব দিয়েছিল। মাত্র-৩-৪ বছরের মধ্যে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা শত শত কোটি টাকার মালিক হলেন কিভাবে! রাজধানীর মহাখালীতে কিভাবে অবৈধভাবে একটি বিলাসবহুল আবাসিক হোটেল নির্মাণ করলেন, তা দেশবাসী জানতে খুবই আগ্রহী। আপনার এই সংসদ সদস্য একজন মিথ্যুক, প্রতারক, ট্যাক্স ফাঁকিবাজ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী তা কি আপনার সরকার অবগত নয়…! তাকে নিয়ে কিছুদিন পূর্বে তুলকালাম কান্ড ঘটে গেলেও তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা কেন নেয়া হল না? সংসদ সদস্যরা কি আইনের উর্ধ্বে? যদি তাই না হয়- তার বিচার করুন এবং তার অবৈধ অর্থ ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করুন। একটা কথা স্মরণ রাখতে হবে, স্বৈরাচার আইয়ুব, ইয়াহিয়া ও জিয়া-এরশাদ দুর্নীতি ও অনিয়ম করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ক্ষমতা কোন কালে, কোন যুগে, কোন সময় স্থায়ী ছিল না, নেই এবং থাকবেও না। তাই ক্ষমতার অপব্যবহার করা ভাল নয়। এখনই সময় দুর্নীতিবাজ সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং নেতা-নেত্রীদের বিচারের আওতায় এনে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করুন। যদি দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে না পারেন তবে দেশবাসী কাউকে ক্ষমা করবেন না। দুর্নীতিবাজরা যে দলেরই হোক, তা মা-মাটি ও মানুষের দুশমন- তাই তাদের ক্ষমার প্রশ্নই আসে না।
আপনার দলের একজন মন্ত্রী, যিনি তার পদে দায়িত্ব পালনকালে আকাশ-বাতাস, ডান-বাম না ভেবে হরহামেশা তার খেয়াল খুশিতে কথা বলতেন। তাকে আপনি কেবলই তার মন্ত্রীর পদ থেকে বাদ দেননি। তিনি তার সংসদ সদস্যের পদ যেমন হারিয়েছেন, তেমনি তার দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদও হারিয়েছেন। এখন আর ওই ব্যক্তি রাস্তায় বের হন না, যদি বের হন জনগণই তার বিচার করবেন। তবে বড়ই দুর্ভাগ্য ওই ব্যক্তি দুর্নীতি করে যে সকল অর্থ ও সম্পদ অর্জন করেছেন তা বাজেয়াপ্ত করা হয়নি বা তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কোন বিচারও হয়নি। অন্যায় করে বা দুর্নীতি করে কেউ যদি বহাল তরিয়তে থাকতে পারে বা তার বিচার করা না হয় তবে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহিত ও পুরস্কৃত হন? অর্থ ও সম্পদ তাহলে আর কতদিন এধরনের জনগণের আত্মসাতকারী ও দুর্নীতিবাজরা পুরস্কৃত হতেই থাকবে? তবে এখনই সময়, এ সকল চোরদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা।
আজ প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে যে সকল দুর্নীতিবাজরা ঘোরাঘুরি করছে তারা যেমন তাঁর মঙ্গল চায় না, তেমনি দেশের মানুষেরও মঙ্গল চায় না। আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার আমলা-কামলা ও সুবিধাবাদীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। আমলারা যখন যাই বলছে তাই-ই যেন বহাল তরিয়তে কার্যকর করা হচ্ছে। দুনিয়ার কোন দেশে একই সময় কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি বা এ ধরনের ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি করা হয়নি। কিন্তু এ দেশে তাই করা হয়েছে। কোন যুক্তিতে বা কোন ফর্মুলায় বর্তমান সরকার একই সাথে এতো বেশি বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করলেন, তার জবাব একদিন এ সরকারকে দিতে হবে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনি। এটা বলতে সামান্যতমও দ্বিধা নেই, বর্তমান সরকার অগনিত ভুল করেছে। সরকারের সবচেয়ে বড় ভুল হলো- প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি করা। যে দেশে লাখ লাখ পদ খালি পড়ে রয়েছে, এই পদগুলোতে নিয়োগ না দিয়ে বেতন বৃদ্ধি করাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত তা সরকার প্রধান একবারও ভাবলেন না। সরকার প্রধান কার কথায় বা কার পরামর্শে বেতন-ভাতা এতোটা বৃদ্ধি করলেন দেশবাসী ভেবে পাচ্ছেন না। ১২৩% ভাগ বেতন বৃদ্ধির ফলে জনগণকে যে বাড়তি করের মাশুল দিতে হচ্ছে তাতে দেশবাসী দারুণভাবে অখুশি ও দিশেহারা। জনসাধারণকে জিম্মি করে তাঁদের ওপর বাড়তি অসহনীয় করের বোঝা চাপানো সম্পূর্ণ ভুল হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। পুনরায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে দেশবাসীর ওপর আবার একটি অবিচার করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক খরচ কমিয়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা থেকে বিরত থাকুন।
ব্যাংকের জমাকৃত অর্থ চুরি হয়েছে। তার জন্য চোরদের বিচার না করে বা শাস্তির ব্যবস্থা না করে বর্তমান সরকার এই চুরি করা টাকার বোঝা দেশের মানুষের উপর চাপালেন কেন? চোরেরা চুরি করে বিদেশে অর্থ পাচার করছে, বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল বাড়ী ও শিল্প-কলকারখানা তৈরী করছে, তা পত্র-পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতি চলছে? দুর্নীতি যে চলছে তা আপনার অর্থ মন্ত্রীর কথায় প্রমাণিত হয়েছে। অথচ এ অর্থমন্ত্রীই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা এমনসব ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি করার সময় বলেছিলেন, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি হলে দুর্নীতি কমবে। বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করে দুর্নীতিতো কমাতে পারলেনই না, অথচ দেশবাসীর সমস্যা বৃদ্ধি করে দিলেন। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী, এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মেয়রদের আর জনগণের মাঝে একটা শ্রেণীভেদ সৃষ্টি করে দিলেন। দুনিয়ার কোন দেশে একই সময়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীসহ অন্যান্যদের বেতন-ভাতা ১২৩% বৃদ্ধি করা হয়নি। সরকারের এ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সিংহভাগ মানুষ দুর্ভোগ ভোগ করছে বা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাষ্ট্রয়াত্ব ব্যাংক, বীমাসহ প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য। ব্যাংক হতে হাজার হাজার কোটি টাকা চুরি হয়ে গেল, সরকার এই চোরদের ধরতে পারলেন না। অথচ ওই চুরির টাকার দায়ভার জনগণের ওপর জোর করে এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। দেশের টাকায় কিছু সংখ্যক চোর-ডাকাতরা বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরী এবং ব্যাংক-ব্যালেন্স করছে, যা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কারা এই চোর? দেশবাসী অধীর আগ্রহে বসে আছেন যে, সরকার ওইসব চোরদের ব্যাপারে কি করেন। দয়া করে বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের চিহ্নিত করে এদের অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করুন। প্রয়োজনবোধে ওই চোরদের জন্য স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অতি শীঘ্রই বিচারের ব্যবস্থা করুন। এ মুহূর্তে জাতির জনকের কথাটি মনে আসছে। তিনি বলেছিলেন- “সবাই পায় স্বর্ণের খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।” সত্যি তিনি সঠিক কথাটিই বলেছিলেন এবং তিনি ওই সকল রাষ্ট্রীয় চোরদের বিচারের জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন….। বড়ই দুর্ভাগ্য তাঁকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট কিছু বিপদগামীদের হাতে জীবন দিতে হয়। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির লালিত স্বপ্ন চিরতরে ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে যদি জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা না দিতে পারেন তবে তাদের ক্ষমতায় থাকার আদৌ প্রয়োজন নেই। যারা ক্ষমতায় আছেন তাদেরকে দেশবাসী বিলাসবহুলভাবে জীবন-যাপনের জন্য বাড়ী, গাড়ী, পাহারাদারসহ ভালো একটা মাসোহারা দিচ্ছেন। তাই ক্ষমতায় থাকতে হলে অবশ্যই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। আর যদি তা না পারেন, তাহলে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে জনগণের কাতারে চলে আসুন। তবে তার আগে অর্থ-সম্পদের হিসাব দিতে হবে, না দিলে দেশবাসী হিসাব আদায় করে নিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে বাধ্য হবে। আশা করবো দেশবাসীকে মারমুখী সিদ্ধান্ত নিতে সরকার বাধ্য করবে না।
উপসংহারে বলবো- পূর্বের সরকারে যারা ছিল তারা যেমন দুর্নীতি করেছে এবং দুর্নীতিবাজ হয়ে বিদায় নিয়েছে। বর্তমান সরকারে যারা আছে তারাও দুর্নীতি করেছে। তাহলে দু’সরকারের মধ্যে তফাৎটা যে কি তা দেশবাসীর প্রশ্ন। দুর্নীতিবাজরা যারাই হোক, যে দলেরই হোক তারা মা, মাটি মানুষের দুশমন। এদের বিচার করতে হবে। যদি এদের কেউ বিচার করতে না পারে তবে দেশবাসী বিচারের ভার নিতে বাধ্য হবে। তবে তার ফল শুভ হবে না। সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করবো, আপনার সরকারের ছত্র-ছায়ায় যারা আছে তারা ফ্রি-স্টাইলে দুর্নীতি করছে। যদি ওদেরকে রুখতে না পারেন তবে তার মাশুল আপনাকেই দিতে হবে।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here