এগিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সমান হতে চায় বিএনপি

0
587

বলেশ্বর আর বিষখালী নদীঘেরা তিন উপজেলা বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগী নিয়ে জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকা বরগুনা-২। আপাত দৃষ্টিতে অনুন্নত মনে হলেও দেশের অর্থনৈতিক বিচারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচনী এলাকা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন এ আসনের কোলঘেঁষেই অবস্থিত। তাছাড়া মৎস্য বন্দর হিসেবে পাথরঘাটার পরিচিতি দেশজুড়ে। নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণে এ আসনকে একক কোনো রাজনৈতিক দলের ঘাঁটি বলা মুশকিল। এ আসনের ভোটাররা খানিকটা হলেও অধিকমাত্রায় ধর্মভীরু। এ কারণে প্রতিবারই নির্বাচনে এখানে বেশ ভালো একটা ভূমিকায় থাকে ইসলামী দলগুলো। এমনকি ইসলামী ঐক্য জোটের প্রার্থীর এখানে বিজয়ী হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এক বাক্যে একটি কথা সবাই বলছেন, মনোনয়ন প্রশ্নে সঠিক প্রার্থী নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করবে এখানকার জয়-পরাজয়। এ লক্ষ্যেই মাঠে আছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।

Advertisement

স্বাধীনতার পর থেকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ আসনে ১১ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ তিনবার, বিএনপি দু’বার, স্বতন্ত্র তিনবার, জাতীয় পার্টি দু’বার ও ইসলামী ঐক্যজোট একবার জয়ী হয়েছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে এগিয়ে থাকতে চায় আওয়ামী লীগ আর জয়ী হয়ে সমান হতে চায় বিএনপি।
নবম সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এমপি গোলাম সবুর টুলু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে উপনির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগের শওকত হাচানুর রহমান রিমন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। বলাবাহুল্য, সর্বশেষ দুটি নির্বাচনেই প্রার্থী ছিল না বিএনপির। তাই এমপি রিমনের জনসমর্থন যাচাইয়ের সুযোগ মেলেনি সেভাবে। বর্তমান এমপি ও বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শওকত হাচানুর রহমান রিমন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের কোষাধ্যক্ষ সুভাষ চন্দ্র হাওলাদার, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক এমপি মরহুম গোলাম সবুর টুলুর মেয়ে ফারজানা সবুর রুমকি, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি নাসিমা ফেরদৌসী, বামনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. হারুন অর রশিদ, বামনা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইতুল ইসলাম লিটু মৃধা ও পাথরঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান উপজেলা যুবলীগের সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম রিপন মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বরগুনা-২ আসনের সাবেক এমপি মো. নুরুল ইসলাম মনি, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মনিরুজ্জামান মনির এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা সগির হোসেন লিয়ন।
এ আসনে বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা আওয়ামী লীগের শওকত হাচানুর রহমান রিমনের বিরুদ্ধে রয়েছে এন্তার অভিযোগ। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার বাবার ‘রাজাকার’ পরিচয়। মাত্র ক’বছর আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া এ নেতার বাবা মুক্তিযুদ্ধকালীন ছিলেন ‘একজন রাজাকার’। জানা গেছে, রিমনের বাবা একেএম খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। এসবের পাশাপাশি এমপি হওয়ার পর একাধিকবার সরকারি কর্মচারীদের মারধর, বিচারের নামে নারী নির্যাতনসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে রিমনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে নারীর মাথায় বিষ্ঠা ঢালার ঘটনায় উচ্চ আদালত সুয়োমটো রুল জারি করে। এসব কারণে নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিশাল একটা অংশ এখন এমপির বিরুদ্ধে। তাদের বিরোধিতার মুখে পাথরঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পর্যন্ত হতে পারেননি রিমন। এসব বিষয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাবার ‘রাজাকার’ পরিচয় প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেননি বরগুনা-২ আসনের বর্তমান এমপি। তবে তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৯৮ সালে প্রথম ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে আসছি। ইউনিয়ন পরিষদে দু’বার চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদে একবার ও জাতীয় সংসদ সদস্য দুইবার নির্বাচিত হয়েছি। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করব, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বলেছি- প্রতিযোগিতা করুন, প্রতিহিংসা নয়। আমার বিরুদ্ধে যেসব কথা বলা হচ্ছে, এর কোনোটাই সত্য নয়। এসবই হচ্ছে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার ষড়যন্ত্র। যারা এসব বলে, তারা হয়তো আমার কাছ থেকে কোনো অবৈধ সুবিধা নিতে পারেনি।’ সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি নাসিমা ফেরদৌসি বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মরতে মরতে বেঁচে আছি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে মূল্যায়ন করেছেন। এমপি বানিয়েছেন। দলের কাছে আমি এবারও মনোনয়ন চাইব।’ বর্তমান এমপি রিমন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এলাকায় কোনো উন্নয়নমূলক কাজ তিনি করেন না। সব সময় দলের বাইরের লোকজন নিয়ে চলেন। গ্রুপিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।’ ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে এখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সুভাষ চন্দ্র হাওলাদার। মনোনয়নের প্রত্যাশায় এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে দান-অনুদান দিচ্ছেন সুভাষ। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতে, বরগুনা-২ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। সেই হিসাবে ক্লিন ইমেজের সুভাষ চন্দ্র নামটি যোগ হলে এখানে ভোটের মাঠে কঠিন ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন যুবলীগের এ কেন্দ্রীয় নেতা। সুভাষ চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ‘আজন্ম আওয়ামী লীগের সঙ্গে রয়েছি। মনোনয়ন পেলে শেখ হাসিনার রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করব।’ বর্তমান এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘গত চার বছরে পাথরঘাটা, বামনা ও বেতাগীতে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন তিনি করেননি। দলের নেতাকর্মীরা বর্তমান এমপির সঙ্গে নেই।’ আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী ফারজানা সবুর রুমকিও মনোনয়নের জন্য মাঠে আছেন। এমপি টুলুর মৃত্যুর পর তার পরিবারেরই কেউ যাতে এমপি হন, সেজন্য চেষ্টা চালিয়েছিলেন দলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু তখন তাদের ফিরিয়ে দেয় টুলু পরিবার। এ পরিবারের আর কেউ রাজনীতির করবে না বলেও জানায় তারা। সেই টুলুর মেয়ে রুমকি এখন মাঠে নামলেও তার ওপর ভরসা আনতে পারছে না অনেকেই। রুমকি বলেন, ‘আমি যদি দলীয় মনোনয়ন পাই, তাহলে আমার বাবার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করব।’
বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের একজন দলটির কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আইনজীবী নেতা খন্দকার মাহবুব হোসেন। বর্তমান মহাজোট সরকারের অংশীদার জেপির (মঞ্জু) চেয়ারম্যান বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় খন্দকার মাহবুব ছিলেন একসময় জাতীয় পার্টির নেতা। ২০০৮ সালে তাকে এ আসনে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। সেবার তাকে হারান আওয়ামী লীগের গোলাম সবুর টুলু। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা হলেও এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ নেই তার। এলাকায়ও খুব একটা আসেন না। তাকে ঘিরে দলের অভ্যন্তরে রয়েছে কোন্দল। বরগুনা জেলা বিএনপির কমিটি প্রশ্নে চলমান এ বিরোধে পুরো জেলাতেই দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে দল। মনোনয়ন প্রশ্নে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘দলের হয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। ম্যাডাম এলাকায় কাজ করতে বলেছেন, কাজ করে যাচ্ছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেব। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি অবশ্যই এখানে জিতবে।’ এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের নেতা মনিরুজ্জামান মনির ওয়ান ইলেভেনের সময় ঝুঁকি নিয়ে দলের জন্য কাজ করেছেন। এলাকায় নানা উন্নয়নমূলক কাজও করেছেন তিনি। মনির বলেন, ‘আমি কী করেছি বা না করেছি, তার মূল্যায়ন করবে দল। আজন্ম বিএনপি করছি, যতদিন বেঁচে থাকব, করব। তবে একটাই দাবি, কোনো হাইব্রিড যেন মনোনয়ন না পায়। এখানে রয়েছে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। সেক্ষেত্রে প্রার্থী সিলেকশনের ভুলে যদি দল হেরে যায়, তাহলে তার চেয়ে কষ্টের আর কিছুই থাকবে না।’ বরগুনা জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট মো. নুরুল আমীন বলেন, ‘বরগুনা-২ আসনের জনপ্রিয় নেতা হলেন মো. নুরুল ইসলাম মনি। তিনি তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। দশম সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। এবার তিনি দলের কাছে মনোনয়ন চাইবেন। আশা করি, দল তাকে মূল্যায়ন করবে।’

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here