খান মো. ফিরোজ কবিরের দুই প্রতিষ্ঠান লভ্যাংশ দূরের কথা আসল টাকাই নেই

0
1120
দুই কোটি টাকা হারিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বীরশ্রেষ্ঠর স্ত্রী * টাকা পাননি আবদুল জব্বারের স্ত্রী শাহীন জব্বার * মুনাফার ফাঁদে বিচারপতি আমলা পুলিশ কর্মকর্তা

অধিক মুনাফার আশায় রাজধানীর মতিঝিলের একটি প্রতিষ্ঠানে দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান। মুনাফা তো দূরের কথা, তিনি আসল টাকাই ফেরত পাচ্ছেন না। লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে তিনি ওই টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অফিস। একই এলাকার চার্টার্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ লিমিটেডে ১৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা রেখেছেন কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বারের স্ত্রী শাহীন জব্বার। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার খান মো. ফিরোজ কবিরের সঙ্গে বারবার দেখা করেও তার কোনো লাভ হয়নি। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে তিনি পাঁচ লাখ টাকা ফেরত পেয়েছেন। বাকি টাকা তিনি এখনও পাননি। শুধু মিলি রহমান বা শাহীন জব্বার নন- এ দুই প্রতিষ্ঠানের ফাঁদে পড়েছেন বিচারপতি, আমলা, চিকিৎসক, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ সমাজের উচ্চপর্যায়ের অনেক ব্যক্তি। প্রতিষ্ঠান দুটির হাত থেকে রেহাই পায়নি স্বল্প আয়ের মানুষজনও।

Advertisement

জানা গেছে, লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও চার্টার্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান দুটি নিয়ন্ত্রণ করেন খান মো. ফিরোজ কবির। চার্টার্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ লিমিটেডের পরিচালনা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ কবির। লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটির উপদেষ্টাও তিনি। বিনিয়োগ নিয়ে প্রতারণা করায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কয়েক দফা রিমান্ড শেষে ফিরোজ কবির, তার মেয়ে ও মেয়ের জামাই এখন কারগারে। অপর একটি মামলায় তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিতে সোমবার আদালতে আবেদন জানিয়েছে পুলিশ। আজ এ রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

সমবায় অধিদফতর ও পুলিশ জানায়, চার্টার্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ লিমিটেডের গ্রাহক সংখ্যা ৪ হাজার ৭৮৯ জন। তাদের অর্থের পরিমাণ ১৩৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অপরদিকে, লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় দুই হাজার জন। তাদের অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে ফিরোজ কবিরের বিরুদ্ধে। ফিরোজ কবিরসহ চার্টার্ড ক্রেডিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর বানানী, ধানমণ্ডি ও মতিঝিল থানায় তিন মাসে ৯টি মামলা করা হয়েছে। এছাড়া আদালতে তিনটি মামলা করা হয়েছে। লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটির বিরুদ্ধেও বেশকিছু মামলা প্রক্রিয়াধীন। মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম রব্বানী জানান, ফিরোজ কবির এবং আজিজুর রহমানকে ২০ জুলাই গ্রেফতার করা হয়। এরপর ফিরোজের মেয়ে ও মেয়ের জামাইকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সফিকুল ইসলাম আকন্দ বলেন, গ্রাহকদের টাকা নিয়ে ফিরোজ কবির বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ দিয়েছেন। এসব ঋণখেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ উদ্ধার করতে পারলে তিনি (ফিরোজ কবির) গ্রাহকদের টাকা পরিশোধ করবেন। সফিকুল আকন্দ আরও জানান, প্রকৃত তথ্য বের করতে আসামিদের ফের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানানো হবে।

ঢাকা জেলার সমবায় কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই দুুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে অধিদফতর। দুই সপ্তাহ ধরে কাজ করছে কমিটি। কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়া গেলে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের মামলা করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় অনেক মামলাও হয়েছে। তাছাড়া সমবায় অধিদফতর বাদী হয়ে ২০ জুলাই মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেছে।

জানা যায়, লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে প্রায় ১৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন বিচারপতি মুস্তফা কামালের মেয়ে অধ্যাপক ও কণ্ঠশিল্পী ড. নাশিদ কামাল। অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল যুগান্তরকে বলেন, তার বাবা এ প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখেছেন। ২০১৫ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সেই টাকা সুদসহ তাদের ভাই-বোনদের পাওয়ার কথা। ফেব্রুয়ারি থেকে তাদের মুনাফার টাকা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফিরোজ কবির তার আত্মীয়স্বজনদের নামে সম্পদ গড়েছেন। গ্রাহকদের টাকায় মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বানিয়েছেন। লভ্যাংশ বাদ দিয়ে টাকা ফেরত চাইলে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নেন ফিরোজ কবির। অন্যদের টাকা আত্মসাতের দায়ে তিনি (ফিরোজ) গ্রেফতার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি দিয়েছে সমবায় অধিদফতর। নাশিদ কামালের অভিযোগ, অধিদফতরের দায়িত্ব অবহেলার কারণেই ফিরোজ কবিরের মতো লোকেরা টাকা আত্মসাতের সুযোগ পেয়েছে।

বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমান যুগান্তরকে বলেন, একজন বীরশ্রেষ্ঠের স্ত্রীর টাকা আত্মসাৎ জাতির জন্য লজ্জাজনক। তিনি বলেন, ওই টাকা আমার একার নয়। আমার ভাই ও মেয়ের টাকাও আছে। তিনি জানান, টাকা ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তাকে মামলা করার পরামর্শ দিয়ে পুলিশ বলেছে, মামলা হলে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোববার মতিঝিল থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

শাহীন জব্বার বলেন, আমার স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই প্রতিষ্ঠানকে টাকার জন্য চাপ দিই। কিন্তু তারা টাকা ফেরত দেয়ার নামে কালক্ষেপণ করতে থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দেয়া হলে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি এবং মতিঝিল থানার হস্তক্ষেপে পাঁচ লাখ টাকা পাই। প্রতিষ্ঠানটি তাকে আরও ১০ লাখ ৩২ হাজার টাকার চেক দিয়েছে। চেকের ডেট ছিল ২১ জুন। কিন্তু চেক ব্যাংকে জমা দিলে ডিজঅনার হয়। এখনও তিনি ওই টাকা পাননি। তিনি বলেন, ফিরোজ কবিরের সঙ্গে দেখা করলে বারবার তাকে শুধু আশ্বাস দেয়া হয়েছে। শাহীন জব্বার আরও জানান, মন্ত্রী, ডিসি, পুলিশ কর্মকর্তার হস্তক্ষেপেও কাজ হয়নি। এখন কী করব, বুঝতে পারছি না। তিনি জানান, তার অবস্থাও এখন গুরুতর। হাঁটুতে জরুরি অপারেশন করা দরকার। কিন্তু টাকার জন্য তা করতে পারছি না।

চার্টার্ড ক্রেডিটে প্রায় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন পুলিশের ডিআইজি মাসুদ মিয়া। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ওই প্রতিষ্ঠানে আমার ৯০ লাখ টাকা আছে। টাকাগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি সাজ্জাদ হোসেন চার্টার্ড ক্রেডিটে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা রেখেছিলেন। ওই টাকা উদ্ধারে তিনি এখন পুলিশের মতিঝিল বিভাগ ও থানার দ্বারস্থ হয়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা প্রায় ১২ লাখ টাকা উদ্ধারের নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি জেটআই তালুকদার। বিনিয়োগকারী মেজর (অব.) হাবীবুর রহমান যুগান্তরকে জানান, ফ্ল্যাট বিক্রি করে চার্টার্ড ক্রেডিটে এক বছর আগে টাকা রেখেছেন। সেখানে তার স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনরাও টাকা রেখেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকা। প্রথম ৪ থেকে ৫ মাস ১২ ভাগ হারে লভ্যাংশ দিলেও এরপর থেকে কোনো টাকা দিচ্ছে না। লভ্যাংশের কিছু চেক দিলেও সেগুলো ডিজঅনার হয়েছে। মেট্রোপলিটন লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের কনসালটেন্ট খন্দকার নজিবুর হোসেন যুগান্তরকে জানান, তিনি জমি ও পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করে লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে ২০০০ সালে এক কোটি টাকা জমা রেখেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি কোনো মুনাফা পাননি। আসল টাকা ফেরত চেয়েও তিনি পাচ্ছেন না। তার বোন উম্মে হাবিবা একই প্রতিষ্ঠানে ১১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মজিবুর রহমান বলেন, লয়েডস কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে তার ৭৩ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রয়েছে। একটি ডিপোজিটের মেয়াদ জুনে শেষ হলেও কোনো টাকা পাইনি। অন্য দুইটি ডিপোজিটের মেয়াদ যথাক্রমে ১৬ অক্টোবর ও ৩০ অক্টোবর শেষ হবে। কিন্তু কোনো ডিপোজিটের টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। সমবায় অধিদফতর মামলা করতে লিখিত অনুমতি দিয়েছে। তিনি আরও জানান, সালমা রুবী নামের একজন ডাক্তার ওই প্রতিষ্ঠানে প্রায় দেড় কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন দিশেহারা। বাংলাদেশ বিমানের সাবেক জিএম আবদুর রশিদ জানান, চার্টার্ড ক্রেডিটে তার ৩৫ লাখ টাকা আছে। গত অক্টোবর থেকে তিনি কোনো টাকা পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ বিমানের সাবেক জিএম দলিল উদ্দিন খান জানান, চার্টার্ড ক্রেডিটে তার মেয়ে, ছেলে, ভাই, অফিসের পিওন, তিনজন কাজের বুয়া এবং নিজেরসহ ৬০ লাখ টাকা রয়েছে। তিন বছর আগে তারা সেখানে টাকা রেখেছেন। সুদ না উঠালে সেই টাকার ওপর আরও সুদ পাওয়া যাবে, এ আশায় কোনো টাকা তোলেননি। তিনি বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হয়ে কীভাবে এ কাজ করলাম বুঝতে পারছি না। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও মাওলানা মো. ইউনুস যুগান্তরকে বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে জমি বিক্রির ১৫ লাখ টাকা চার্টার্ড ক্রেডিটে রেখেছেন। এর মধ্যে একটি ডিপিএস ও চারটি এফডিআর। সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। শামীম নামে একজন যুগান্তরকে জানান, চার্টার্ড ক্রেডিটে তিনি ২৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মেইট লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালক খালেদ বিন হাবীব বলেন, এক বছর আগে ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানে ঝামেলা শুরু হয়। লভ্যাংশ তো দূরের কথা, আসল টাকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছি। মেইট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির সিনিয়র জিএম বিমল চন্দ্র জানান, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ১৪ ভাগ মুনাফায় তিনি চার্টার্ড ক্রেডিটে ৪০ লাখ টাকা রাখেছেন। ২০১৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত লভ্যাংশ পেলেও এরপর থেকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজধানী এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার ও ইট ব্যবসায়ী এসএ মাহবুব জানান, প্রায় ১৩ বছর আগে ১১ থেকে সাড়ে ১৩ ভাগ মুনাফায় তিনি ৬৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। গত সেপ্টেম্বর থেকে তাকে কোনো মুনাফা দেয়া হচ্ছে না।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here