চাপ আসতে পারে, নিজস্ব বিবেচনায় মোকাবিলা করতে হবে: অর্থমন্ত্রী বড় ঋণে অসহায় অগ্রণী ব্যাংক

0
464

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গতকাল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের ৫০০তম পর্ষদ সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন l রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালকেরা বলেছেন, বড় ঋণ দিয়ে আদায় করা যাচ্ছে না। এখন আর বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া সম্ভব না। সময় এসেছে ছোট ঋণের দিকে নজর বাড়ানোর। বড় ঋণ দিতে হলে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক মিলে সিন্ডিকেট করে দেওয়া যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে গতকাল সোমবার এসব দাবি জানান অগ্রণী ব্যাংকের তিনজন পরিচালক। অগ্রণী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৫০০তম সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল মতিঝিলে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যাংকটির পরিচালক গকুল চাঁদ দাস বলেন, বড় অঙ্কের ঋণ দিতে হলে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক মিলে সিন্ডিকেট করে দিতে হবে। এর ফলে ঋণ আদায়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর ঋণ আদায়ে একটা চাপ থাকবে। অর্থঋণ আদালত আইন সংস্কার করা প্রয়োজন। অনেকে শতকোটি টাকার ঋণ নিয়ে রিট করে বসে থাকছে। তাদের কিছুই করা যাচ্ছে না।
ব্যাংকের পরিচালক নিতাই চন্দ্র নাগ বলেন, হানিফ ফ্লাইওভারে বড় অঙ্কের টাকা আটকে আছে। কিছুই করা যাচ্ছে না। এখানে সরকার কিছু করতে পারে কি না ভেবে দেখা প্রয়োজন। বড় যেসব ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না, এসব বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা প্রয়োজন।
অপর পরিচালক কাশেম হুমায়ুন বলেন, খেলাপি ঋণ বড় ব্যথা হয়ে উঠছে। খেলাপি ঋণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে এ খাতের সঙ্গে যারা জড়িত, সবার জন্যই কাজ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। এখন সময় এসেছে বড় ঋণ না দিয়ে ছোট ঋণের দিকে নজর বাড়ানোর।
এর জবাবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘আগের পরিচালনা পর্ষদ পুরো ভালো দিতে পারিনি। তবে এখন সরকারি ব্যাংকগুলোর পর্ষদ যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। পর্ষদগুলো পরিচালনায় কোনো ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হয় না। ব্যবস্থাপনা পর্ষদকেও পুরো স্বাধীনতা দিয়েছি। সরকার, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক চাপ আসতে পারে, তা নিজস্ব বিবেচনায় মোকাবিলা করতে হবে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি ব্যাংক নিয়ে কথা হলে শুধু খারাপ বিষয়গুলো আসে। মূলধন ঘাটতি, প্রভিশন ঘাটতি, হলমার্ক, বেসিক কেলেঙ্কারি। কেলেঙ্কারির কথা স্বীকার করতেই হবে। এসব অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সরকারি ব্যাংকগুলো কিছু ভালো কাজও করছে।
হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, শাখার তত্ত্বাবধান খুবই জরুরি। তদারকি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শাখা তদারকি না করার ফলেই বড় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। পর্যবেক্ষণ ও তদারকি থাকলে ঘটনাটা এত বড় হতো না। তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ধরার পর কাউকে শাস্তি দিলে সবাইকে খুশি হতে দেখা যায়। কেন এ শাস্তি দিতে হয়? কাউকে শাস্তি যেন দিতে না হয় এমন ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী ব্যাংক পরিচালনার জন্য দুটি নির্দেশনা দেন অগ্রণী ব্যাংককে। কোনো গ্রাহককে ঋণ দেওয়ার আগে ভালোভাবে চেনা ও জানার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া ঋণ দেওয়ার পর গ্রাহক যেন সমস্যায় না পড়ে, সেদিকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেন। ব্যাংকের সেবার মান ও ধরন উন্নত করার পাশাপাশি নতুন নতুন সেবা চালুরও পরামর্শ দেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেন, ‘সরকারি যেসব মাশুলবিহীন সেবা দেওয়া হচ্ছে, তার মূল্য নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাও। আমরা এর কিছুটা তো দিতেই পারি।’ তিনি বলেন, ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁর কার্যক্রমে শুধু সাফল্য তুলে ধরেছেন। ব্যর্থতাগুলোও তুলে ধরলে ভালো হতো।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে পুরো স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আপনারা নিয়ম মেনে পূর্ন স্বাধীনভাবে ব্যাংক পরিচালনা করেন। আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই। নির্দেশনার তো একটা মূল্য আছে। এই মূল্যের কে দায়ভার নেবে।’
গভর্নর ফজলে কবির বলেন, পুরো ব্যাংক খাতের তুলনায় অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আড়াই গুণ বেশি। খেলাপি ঋণের মধ্যে ৮০ শতাংশই মন্দ মানের। শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই বেশি ঋণ। দুটি গ্রুপকে মূলধনের ২৫ ভাগ ঋণ দেওয়া হয়েছে। ৭ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা মামলার কারণে আটকে আছে। এসব সূচকের উন্নতি ঘটাতে হবে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান বলেন, বড় ঋণ মানেই বড় খেলাপি। আর বড় খেলাপি মানেই বড় সমস্যা। সরকারি ব্যাংকগুলোর ৫০ শতাংশের বেশি শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছে। সারা দেশ থেকে টাকা এসে প্রধান কার্যালয়ের নিচের শাখায় জমা হয়। এ ঋণ যায় গুটি কয়েক ব্যক্তির কাছে। এসব টাকা ফেরত আসছে না, এভাবে আর কত। আর বড় ঋণ দেওয়া যাবে না।
ইউনুসুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর ইউনিয়নগুলো ঠিক করে দেয় ঋণ কাকে দেওয়া হবে। এসব বন্ধ করতে হবে। ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পুরোই স্বাধীন। সিদ্ধান্তও নিতে হবে স্বাধীনভাবে। এতে মন্ত্রণালয় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে খেলাপি হওয়া বন্ধ করেছি। ব্যাংকের প্রধান শাখার ৪২ শতাংশ ঋণই খেলাপি। আমরা দায়িত্ব নিয়ে ১৮ প্রতিষ্ঠানকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছি। এর মধ্যে ২২ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদ স্বচ্ছ হলেও চলবে না। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদকে সক্রিয় না হলে উন্নতি ঘটবে না।’
অনুষ্ঠানের শুরুতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা তুলে ধরেন। অর্থমন্ত্রী ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ ভাস্কর্য উদ্বোধন করেন। এ কর্নারে বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত বই ও সিডিসমূহ সংরক্ষিত আছে।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here