চিকিৎসক ব্যবসায়ী দালাল সিন্ডিকেটের বাণিজ্য

0
1278

সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন- এমন কয়েকজন চিকিৎসক পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন পাওয়ার আগেই হাসপাতালটি চালু করে দিয়েছেন তারা। মিটফোর্ড হাসপাতালকে কেন্দ্র করে অন্তত এমন আরও ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে তোলা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে তিনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিঠি দিয়েছে। এর পরও ওই তিনটি প্রতিষ্ঠানসহ সবাই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। একশ্রেণির দালালচক্র কমিশনের বিনিময়ে মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে এসব হাসপাতালে নিয়ে আসে। সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই দালালচক্রের কয়েকজনকে জেল-জরিমানাও করেছেন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের দেয়াল ঘেঁষে গড়ে তোলা মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতালটির চেয়ারম্যান ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের ডা. মোশাররফ হোসেন। পরিচালক হিসেবে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল, মিটফোর্ড হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাকসুদা ফরিদা মিলি ও ডা. মুর্শিদা পারভীন। এ ছাড়া আগে মিটফোর্ডে ছিলেন, সম্প্রতি অন্যত্র বদলি হয়েছেন- এমন চিকিৎসকের মধ্যে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ আল হাসান, মাদারীপুর সদর হাসপাতালের ইএনটি বিভাগের পরামর্শক ডা. তৌহিদুল আলম ও গাইনি বিভাগের পরামর্শক ডা. পাপিয়া সুলতানা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। তবে অন্য তিন পরিচালক ইএনটি বিশেষজ্ঞ ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, ডা. মামুন-উর রশীদ ও ডা. জাহান আরা সরকারি চাকরিতে নেই। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর মিটফোর্ড টাওয়ারের চতুর্থ ও পঞ্চমতলা নিয়ে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নিচতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত শতাধিক ওষুধ, গজ-ব্যান্ডেজ, কেমিক্যালের দোকান রয়েছে। ৪০ শয্যার এ হাসপাতালে প্যাথলজি, রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগ পুরোপুরি চালু করা হয়েছে। প্রায় দেড় মাস আগে এ হাসপাতালের পথচলা শুরু।

Advertisement

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, হাসপাতালের সাজসজ্জা, দুটি ফ্লোর ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটার জন্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২১ জন অংশীদারের প্রত্যেকে দেড় কোটি টাকা করে দিয়েছেন। ব্যয়বহুল এ হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য তারা সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করলেও অনুমোদন মেলেনি। তবুও চালু করা হয়েছে হাসপাতালটি।পরিচালক ডা. আবদুল্লাহ আল হাসানের সঙ্গে হাসপাতালের বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয়। হাসপাতালের মালিকানায় চিকিৎসকদের সম্পৃক্ত থাকার কথা তিনি স্বীকার করেন। ডা. আবদুল্লাহ মিটফোর্ড হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ছিলেন। কয়েক মাস আগে তাকে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে বদলি করা হয়। তিনি জানান, তারা ১০ চিকিৎসকের পাশাপাশি ব্যবসায়ী, স্থানীয়সহ ২১ জন মিলে হাসপাতালটি গড়ে তুলেছেন। আপাতত দুটি ফ্লোর তারা কিনে নিয়েছেন। ভবন মালিক ও নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে, ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ হলে তারা আরও ফ্লোর কিনে নেবেন।

রোগী উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. আবদুল্লাহ আল হাসান আরও বলেন, নতুন হাসপাতাল তৈরি হয়েছে। এখনও রোগীদের কাছে সেভাবে মার্কেটিং করতে পারিনি। তাদের পরিচিত এবং সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেতে বিড়ম্বনায় পড়েন, এমন রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। ভবিষ্যতে বড় ধরনের মার্কেটিং পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে সরকারি চিকিৎসকরা মালিকানায় থাকতে পারেন কি-না এ সম্পর্কিত প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি ওই চিকিৎসক। সরকারি চিকিৎসকদের এভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকা চাকরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন একাধিক সরকারি কর্মকর্তা। এ ছাড়া সরকারি মেডিকেল কলেজের দেয়াল ঘেঁষে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসকরা নিজেরাই সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে তাদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের কর্মচারীরাও কমিশনের বিনিময়ে রোগী বাগিয়ে এ হাসপাতালে আনেন। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেসব নিয়মকানুন মানতে হয়, এই প্রতিষ্ঠান তা মানেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. সাইদুর রহমান বলেন, সরকারি হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকরা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকতে পারেন না। যদি কোনো চিকিৎসক এমনটি করে থাকেন, তা চাকরিবিধির লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার ওই পরিচালক আরও বলেন, হাসপাতাল হতে হবে ভবনের নিচতলা থেকে। প্রশস্ত সিঁড়ি থেকে শুরু করে অধিদপ্তরের সব শর্ত পূরণ করতে হবে। নয়তো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদন দিতে পারবে না। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্ধারিত শর্তের বাইরে কেউ হাসপাতাল পরিচালনা করলে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। পরিচালকের এই বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি পুরান ঢাকার মিটফোর্ডের অধিকাংশ হাসপাতালে। মেডিলাইফ হাসপাতালের পাশের ভবনে মুনলাইট নামে হাসপাতালটি তৃতীয় তলা থেকে শুরু হয়েছে। হাসপাতালের চলাচলের পথে শয্যা পেতে রোগী রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শর্তাবলি পূরণ না করায় এ হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ করা হয়েছে। তবুও এ হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম থেমে নেই। হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান একই সঙ্গে মেডিলাইফ হাসপাতালেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। একইভাবে মিটফোর্ড রোডের বাঁধন হাসপাতাল, ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপরও প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া মিটফোর্ড রোডে ঢাকা হাসপাতাল, নিউ ঢাকা হাসপাতাল এবং মেডিসান ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতালের মালিক আশোক ঘোষ, বাঁধন হাসপাতালের মালিক সুব্রত মলি্লক, নিউ ঢাকা মডার্ন ক্লিনিকের মালিক ডা. নিজামউদ্দিন নামের একজন চিকিৎসক। মিটফোর্ড হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের আবাসিক সার্জন থাকাকালে ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল আল-আরাফাত হাসপাতালের একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পরও তিনি নিয়মিত ওই হাসপাতালে প্র্যাকটিস করতেন। কয়েক বছর ধরে মুন লাইট নামে আরও একটি হাসপাতালে প্র্যাকটিস করছেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই হাসপাতালের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে চিঠি দিয়েছে। জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল মেডিলাইফ স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং আল-আরাফাত হাসপাতালের মালিকানায় থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি সমকালকে বলেন, মিটফোর্ড হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের আবাসিক সার্জন থাকাকালে ১৯৯৬ সালে তিনি একজনের কাছ থেকে হাসপাতালটি কিনে নিয়েছিলেন। কিন্তু দুই যুগেও এই হাসপাতাল থেকে কোনো মুনাফা পাননি। নিজ এলাকার দরিদ্র মানুষকে এই হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার কথা দাবি করে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বেসরকারি হাসপাতালের পোস্টেট অপারেশনের জন্য ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি মাত্র ১০ হাজার টাকা নেন। দরিদ্র মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে গেলে প্রতারিত হয়। কিন্তু তার হাসপাতালের বিরুদ্ধে কেউ প্রতারণার অভিযোগ করতে পারবেন না বলে দাবি করেন তিনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিভিন্ন সময়ে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের অনুমোদন দিয়েছেন। শিগগিরই অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জোরদার অভিযান চালানো হবে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল রোডে বাঁধন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আল-আরাফাত হাসপাতাল, মুনলাইট ক্লিনিক, মিটফোর্ড ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেন্টার, ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতাল ও পুষ্প ড্রাগ হাসপাতালে চিকিৎসার নামে প্রতারণার দায়ে ১৬ জনকে ২২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান শুরু হয়েছে। যত বড় শক্তিশালী ব্যক্তিই হোক না কেন, কাউকে অবৈধভাবে হাসপাতাল-ক্লিনিকের নামে বাণিজ্য করতে দেওয়া হবে না। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে যে কোনো মূল্যে শৃঙ্খলায় ফেরাতে হবে। তাই এ বিষয়ে সরকার কোনো আপস করবে না।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here