‘ছেলে-মেয়ের অ্যাপার্টমেন্ট আছে, অথচ বৃদ্ধাশ্রমে আছি ১৮ বছর ধরে’

0
836

‘অধ্যক্ষ ছিলাম,কলামও লিখতাম, ছবিও আঁকতাম। এখন এখানে বসে বসেই ছবি আঁকি। গত ১৮ বছর ধরে এখানেই আছি।’ বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের চারতলার বারান্দায় গ্রিলের ভেতর দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে কথা বলছিলেন মুজিবুল হক। বললেন,‘ধানমন্ডিতে ছেলে-মেয়ের অ্যাপার্টমেন্টও আছে। অথচ আমি এখানে আছি গত ১৮ বছর ধরে।’

Advertisement

এত বছর ধরে এখানে কেন জানতে চাইলে-তিনি বলেন, ‘ভালো আছি তাই, অথবা থাকতে হবে তাই আছি। অন্য কোথাও নিরাপদ মনে করি না। স্ত্রী নেই, কিন্তু অন্য যারা আছে তাদের সঙ্গে থাকা যাবে না। আধুনিককালের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারি না। তাই বোধহয় আমরা এখানে আছি।’ তিনি আরও বলেন,‘তবে খরচটা এখন বেড়ে গেছে। যেটা অনেকের পক্ষেই সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এখানে যখন প্রথম আসি তখন খাওয়া হয়ে যেত ৬০০-৬৫০ টাকায়। এখন আড়াই হাজার টাকায়ও খাওয়া হয় না। আমি এখানকার পুরাতন বাসিন্দাদের একজন।’

১৮ বছর ধরে একা থাকার কষ্টটা বোধহয় দেখাতে চাইলেন না এই শিল্পী। কথা পাল্টে বলেন, ‘তবে আরও বেশি ভালো লাগে তোমাদের মতো ছেলে-মেয়েরা মাঝে মাঝে এখানে বিরিয়ানি,মোরাগ পোলাও, আইসক্রিম খাওয়ায়। এগুলো আরও বেশি ভালো লাগে। আমি টিভি দেখি বেশি। টিভি দেখতে ভালোবাসি, নিজেকে দেখতেও ভালো লাগে আমার। জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আমাদের সুখে ভরা, কিন্তু আমরা সেটি মনে রাখি না। কান্নাটাকে বেশি করে দেখি।’

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে একটি সাদাকালো ছবি সব সময়ের সঙ্গী ফিরোজা বিশ্বাসের১৮ বছর ধরে একা আছেন, কষ্ট লাগে না– আবার প্রশ্ন করতেই মুজিবুল হক বলেন, ‘আই কেইম অ্যালোন, আই হ্যাভ টু গো অ্যালোন-দ্যাটস ট্রু, দ্যাটস দ্য রিয়েলিটি, দেয়ার ইজ আল্লাহ, দেয়ার উইল বি আল্লাহ-তুমি এটা বিশ্বাস করো বা নাই করো। তাই আমার কোনও কষ্ট নেই। আমি ভালো আছি।’ বলে মুখ ফিরিয়ে নিলেন মুজিবুল হক।

১ অক্টোবর প্রবীণ দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘে গিয়ে কথা হয় সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে অনেকেই উচ্চ শিক্ষিত, কেউ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও রয়েছেন। নাম-ছবি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তাদেরই একজন বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষিত, কেউ কেউ অনেক উঁচু পদে চাকরি করছেন, সংসার করছেন। তাদের শান্তির জন্য সাজানো সংসার ছেড়ে বছরের পর বছর ধরে এই বয়সে একা আছি এখানে। তাই কথা বলতে পারি, কিন্তু নাম এবং ছবি দেওয়া চলবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের স্ত্রী-যিনি নিজেও একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে মানুষ আসে অসহায় হয়ে, সেই শিশু বয়স আর এই বৃদ্ধ বয়স-দুটোই এক সুতোয় গাঁথা। কারও সাহায্য ছাড়া চলা যায় না, অথচ আধুনিক কালের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে আজ আমি এখানে। কিন্তু সবাইকেই বুঝতে হবে, প্রত্যেকেরই বয়স হবে। আজ আমি যাদের জন্য এখানে-তাদেরও একদিন এখানে আসতে হতে পারে। কারণ প্রকৃতি কাউকে ক্ষমা করে না।’ সন্তর্পণে চোখ মুছেন তিনি।

এই নারী আরও বলেন, ‘অন্যের সন্তানকে স্কুলে নৈতিকতা শিক্ষা দিয়েছি, কিন্তু নিজের ঘরেই সেটা করতে পারিনি। কিন্তু একটা মানুষ একা থাকতে পারে না-এই সামাজিক মূল্যবোধগুলো জাগিয়ে তুলতে হবে। মানুষ সামাজিকতা ভুলে গেছে। গাদা গাদা বই পড়ে বড় অফিসার হয়তো হওয়া যায় কিন্তু মানুষ হওয়া যায় না।’

নাদিরা বেগম মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ৭৮ বছরের চন্দনা শতদ্রু (মিনি মর্জিনা) লেখাপড়া করেছেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। ২০১৫ সাল থেকে এখানে আছেন। তিনি বলেন, ‘আগে তো এসব ওল্ড হোম ছিল না, কিন্তু এখন কেন হচ্ছে? আগে তো একান্নবর্তী পরিবার ছিল-এখন কেন থাকছে না। ছেলেমেয়েরা কি দুজন মানুষকে খরচ দিয়ে চালিয়ে রাখতে পারে না– প্রশ্ন করে তিনি বলেন, মানুষ সামাজিকতা ভুলে গেছে, প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে শিকড় ভুলে গেছে।’ ছোটবেলা থেকেই খুব ভালো গান গাইতেন নাদিরা রহমান। তিনি বলেন, ‘গান গেয়েছি-ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ। কই গেল সেই গানের কথা? এখন তো কোথাও কোনও ভালোবাসা নেই, স্নেহ নেই, শ্রদ্ধা নেই। তাই ছোটবেলা থেকে পাঠ্যপুস্তকে একটা অধ্যায় রাখতে হবে। যেখানে শেখানো হবে, বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেলেমেয়েদের দেখতে হবে, কী দরকার আমাদের দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের (বৃদ্ধ নিবাস)।’ তিনি বলেন, ‘ছোটবেলার শিক্ষাটা মজ্জাগত হয়, সারাজীবন মনে থাকে। বিদ্যালয়গুলোয় সেমিনার করতে হবে, ছোটবেলাতেই তাদের বোঝাতে হবে, এ শিক্ষাটা দিতে হবে যে বৃদ্ধ হলে বাবা-মাকে তোমাদের দেখতে হবে। বংশ পরম্পরায় এটা দায়িত্ব হয়ে এসেছে সমাজে, সেই দায়িত্ববোধকে কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না। তাদের দেখতে হবে, ব্যবস্থা করতে হবে। কয়েক বছর পর যখন বৃদ্ধদের সংখ্যা বাড়বে তখন তারা যাবে কই। সরকার কতজনকে এরকম ওল্ডহোমে রাখবে।’

যুক্তরাষ্ট্র থেকে গত এপ্রিলে দেশে ফিরে এই নিবাসে আশ্রয় নিয়েছেন ফিরোজা বিশ্বাস। স্বামী মারা গেছেন। পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে দুজন যুক্তরাষ্ট্র, দুজন কানাডা আর একজন আছেন অস্ট্রেলিয়াতে। তিনি বলেন, ‘সবাই যে যার কাজে চলে যায়, একা খুব বোরিং লাগতো। ছেলে-ছেলের বউরা কাজে চলে যেত, কিছুদিন নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কাটিয়েছি। তারাও এক সময় বড় হলো, যার যার নিজের জগৎ হলো। তখন আমি একা হয়ে গেলাম আবার। কিন্তু আমি কথা বলতে ভালোবাসি। চেয়েছিলাম স্বামীর কবরের পাশে আমার কবর হোক। সে ব্যবস্থাও আমি করে রেখেছিলাম আগেই। আমরা স্বামী-স্ত্রী যতোটা না ছিলাম, তার চেয়েও বেশি ছিলাম বন্ধু।’ তিনি বলেন, ‘ফেলে আসা জীবন আনন্দের, কিন্তু সেটা নিয়ে চোখের পানি ফেলি না আমি।’ আমেরিকার বিলাসি জীবন ছেড়ে এই প্রবীণ নিবাসে একা আছেন, আপনার ঘুম হয়– প্রশ্ন করলে অশ্রুসজল চোখে ফিরোজা বিশ্বাস বলেন, ‘স্বাধীন মানুষের ঘুম না হলে কার হবে।’

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here