নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য দূরীকরণের আর্š—জাতিক প্রচেষ্টার ফসল হল ‘সিডও’ সনদ

0
1502

সাহেনা আক্তার হেনা
নারীর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। দিনের পর দিন এই সহিংসতা নিরসনে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও দেশে নারী নির্যাতন  বেড়েই চলেছে। নারীর প্রতি এই সহিংসতা ও বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করতে হলে, নারী সর্ম্পকে চিরাচরিত চিন্তা ভাবনায় এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে পরির্বতন আনতে হবে। নারীর প্রতি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে হলে নারীকেই নীরবতার দেয়াল ভাঙ্গতে হবে, প্রতিবাদী হতে হবে। একই সাথে নারী কৃত্বিতের উদাহরণ তৈরি করতে হবে যা নারীর প্রতি সমাজের তথাকথিত দৃষ্টিভঙ্গির পরির্বতন আনবে। কেননা নারীর প্রতি সহিংসতা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছেনা। বরং দি-দিন এই বর্বরতা আর সহিংসতার মাত্রা বেড়েই চলছে। বর্তমান সময়েও ক্রমান্বয়ে চলছে মধ্যযুগীয় পন্থায় নারীর শরীরে আগুন দেয়া, র্ধষণ-গনর্ধষণ, নির্যাতনের পর হত্যা, শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে নেয়া, এসিড নিক্ষেপ, পতিতালয়ে বিক্রি, নারী পাচারসহ নানা কৌশলে নির্যাতন। রাস্তাঘাটে, অফিস আদালতে, যানবাহনে, হাটে বাজারে শিকার হতে হয় নিরব নির্যাতনের। যে নির্যাতনের চিৎকার বাইরে আসতে দেয়া হয়না চার দেয়ালের ভেতর গুমরে কাঁেদ বোবা পশুর মত। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, নারী সমাজের কাঙ্খিত মুক্তি আজো আসেনি। নারী ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন, নারী উত্যেক্ত করা, নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণার্থে দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্বও কোনো অংশে কম নয়। আমাদের সবাইকে নারীর যে মানবাধিকার তা প্রতিষ্টা করতে হবে। নারী নির্যাতনকে সামাজিকভাবে অগ্রহনযোগ্য ও দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গন্য করতে হবে। তাহলেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ একটি নতুন সমাজ বিনির্মাণে সফল হবো। ৩ সেপ্টেম্বর আর্ন্তজাতিক ‘সিডও’ দিবস। সিডও হচ্ছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সম্পর্কিত সনদসমূহের অন্যতম যার অর্থ দাঁড়ায় ‘নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ’। লাখ লাখ বছর ধরে চলে আসা নারীর প্রতি সহিংসতা ও অবিবেচনামূলক বৈষম্য দূরীকরণের আর্š—জাতিক প্রচেষ্টার ফসল হল ‘সিডও’ সনদ। এই সনদকে বলা হয় ‘নারীর মানবাধিকার দলিল’। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং সহিংসতা দূরীকরণে গৃহীত এই সনদ ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্বব্যাপী কার্যকর হতে শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকার ৪টি ধারা সংরক্ষিত রেখে ১৯৪৮ সালের ৬ ডিসেম্বর এতে স্বাক্ষর করে। স্বাক্ষর করা মানেই ‘সিডও’ সনদের সাথে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করা এবং নিজ দেশে তা বাস্তবায়নে অঙ্গিকারাবদ্ধ হওয়া। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, স্বাক্ষরের এত বছর পরও সনদের গুরুত্বপূর্ণ ধারাসমূহ বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হয়নি। সিডও সনদের মূলকথা হল উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারী যুগ যুগ ধরে যে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে তার যথাযথ স্বীকৃতি দান। যদিও নারীর যথাযথ স্বীকৃতি দানই সিডও সনদের মূলকথা তথাপি সমাজ, রাষ্ট্রসহ সমস্ত বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্যেই প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপন করাই এর লক্ষ্য। একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে যেমন আন্তর্জাতিক নারী দিবস বিশ্বজুরে পালন করা হলেও আমাদের দেশে বিশেষভাবে এই দিনটি নারী মুক্তির প্রতীক দিবস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি, নারী পুরুষের মধ্যে সমতার চেতনা সঞ্চারিত করার ক্ষেত্রে এই দিনটির ভূমিকা অসাধারণ। কারণ নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে স্থায়ী কোনো উন্নতি আশা করা যায় না। আমাদের দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূর্ণ মর্যাদায় এই দিবসটি পালন করা হয়। বিশ্ব নারী দিবস প্রবর্তনের পর থেকে নারী প্রগতির আন্দোলন যে নতুন মাত্রা লাভ করতে শুরু করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় নারী সমাজের আজকের সব অর্জন। বাংলাদেশের নারীরা আজ নির্মমভাবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার। মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে সর্বদাই স্বামী কতৃক আগুনে পুড়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করে গৃহবধু, গ্রামে পাটের ক্ষেতে-ভুট্টার ক্ষেতে বা ডোবা-নালায় ধর্ষিতা নারীর লাশ পাওয়া যায়, বিষপান করে অথবা সিলিং ফ্যানে ঝুলে নারীর আতœহত্যার ঘটনা এদেশের এখন অত্যন্ত স্বাভাবিক। ৭০ ভাগ নারী এদেশে অপুষ্টি এবং রক্তস্বল্পতার শিকার। যৌতুক নামক ভাইরাসে গোটা জাতি আক্রান্ত। নারী হয়ে জন্ম  নেয়ার অপরাধে সারাজীবন তাদের নির্যাতিত হতে হয়। নিজের অধিকার এবং প্রাপ্য স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। আশ্রিতা হয়ে, পরমুখাপ্রেক্ষী হয়ে, বোঝা হয়ে, দুর্বিষহ যন্ত্রনা নিয়ে নারীকে এদেশে বেঁচে থাকতে হয়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি ৩ জনের মধ্যে একজন নারী এখনো নির্যাতনের শিকার এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি ৬০ শতাংশ নারী এই  নির্যাতনের ব্যাপারে নিরব থাকে। আমাদের দেশের নারীরা এখনো ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না। কর্মক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর পারিশ্রমিক অনেক কম, কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। যৌন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি আশংকাজনক। গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকরা দেশের জন্য প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা এনে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখছে; অথচ কারখানায় আগুন লাগার কারনে আগুনে পুড়ে তাদেরই বহুজনকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। একের পর এক আগুনে পুড়ে মরার মর্মান্তিক ঘটনার পরও কর্তৃপক্ষের বোধোদয় পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায় না। নেয়া হচ্ছে না প্রতিকারের স্থায়ী কোন ব্যবস্থা। এ অবস্থা কোনোভাবেই জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির সহায়ক হতে পারে না। তাই পুরুষের সমান সুযোগ, মজুরি ও সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করা অজ খুবই জরুরী। এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় নারী নির্যতন চলছে নির্বিচারে, শ্লীলতাহানি, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, পুড়িয়ে মারা, বহুবিবাহ, যৌতুকসহ ফতোয়াবাজি চলছে অহরহ। নির্মম নির্যাতন শেষে হত্যার ঘটনা ঘটে চলছে আদিবাসি ও প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষেত্রেও। আইন আছে কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবহেলাই দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ট নারীকে ক্ষমতাহীন করে রেখেছে। অথচ নারীরা আজ বাঁধাধরা কিছু ক্ষেত্রে নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের দৃপ্ত পদচারণ রয়েছে। নানা চ্যালেঞ্জিং পেশায় তারা অবর্তীণ, উচ্চতর পর্বতশৃঙ্গে আরোহণের ক্ষেত্রেও সমান দক্ষতা প্রর্দশন করে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে তারা। বহু অভাবনীয় পদে নারীরা কাজ করে যাচ্ছে দাপটের সঙ্গে। আজকের বাংলাদেশে নারীকে অসহায় করে রাখার মাধ্যমে যত নিষ্ঠুরভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে অন্য কোনভাবে তা হচ্ছেনা। বাংলাদেশের সংবিধান সম্পূর্ণরুপে ‘সিডও’ সনদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও পরিপূরক। বিধি মোতাবেক সিডও সনদ অনুমোদনের এক বছরের মধ্যে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি ৪ বছর অন্তর সিডও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত জাতীয় প্রতিবেদন জাতিসংঘ সিডও কমিটির কাছে পেশ করার বিধান সিডও সনদে রাখা হয়েছে। স্বাক্ষরিত দেশসমূহকে প্রতি চার বছর পর জাতিসংঘ সিডও কমিটির কাছে সনদ বাস্থবায়নের অগ্রগতি নিয়ে রির্পোট পেশ করতে হয়। প্রতিবারই সিডও কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য অনেক টাকা খরচ করে বাংলাদেশ উচ্চ পর্যায়ে প্রতিনিধি প্রেরণ করে। সিডও কমিটি বাংলাদেশ সরকার কতৃক নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন ও নারী নির্যাতন বন্ধ করার লক্ষ্যে গৃহীত আইন নীতিমালা এবং কার্যক্রমের প্রশংসা করার পাশাপাশি এ সকল আইন-নীতিমালা-কার্যক্রমের সঠিক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সর্ম্পকে উদ্ধেগ প্রকাশ করে। এ ক্ষেত্রে ‘সিডও’ সনদ দুইটি ধারায় সরকারের সংরক্ষণ বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখনো যে কোনো বয়সের নারীর উপর যে মাত্রায় সহিংসতা হয় তা আইন নীতিমালার কার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। নারীর অধিকারের মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দান করাই এই সনদের মূল লক্ষ্য। এই মূল কথাগুলিকে ধারণ করে তিনটি মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিডও সনদ। (১) সমতার নীতি, (২) বৈষম্যহীনতার নীতি, (৩) শরিক রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্বের নীতি। মানবধিকার সংরক্ষনের কথাই বলি বা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথাই বলি না কেন, সব দিক দিয়েই ‘সিডও’ সনদের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি কারণ বিশ্বব্যাপী নারীর অবস্থান এখনও প্রান্তিক পর্যায়ে এবং বাংলাদেশের নারীরা প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রম করছে এক দুর্বিষহ অবস্থায়। তথ্য মতে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯নং ধারায় বলা হয়েছে Ñ ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্থরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে’। ২৭নং ধারায় বলা হয়েছে Ñ ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। ২৮ নং ধারায় বলা হয়েছে – ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিককের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রর্দশন করবে না’। রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্থরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবে। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনো রুপ অক্ষমতা এবং বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাবেনা’, আরো বলা হয়েছে Ñ ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী , বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রর্দশন করা যাবে না। ‘সিডও’ সনদের ২নং ধারায় নারীর প্রতি বৈষম্যম্যূলক রীতিনীতি, প্রথা, আচার-ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার নীতিমালা গ্রহণের উপর জোর দেয়া হয়েছে। এছাড়াও সকল ক্ষেত্র নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ, আদালত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নারীকে বৈষম্য থেকে রক্ষা করা, ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতৃক নারীর প্রতি বৈষম্য প্রর্দশন রোধ করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহনের কথা বলা হয়েছে । এমনকি ১৬১-এর (গ) ধারায় বিবাহ, বিবাহে পছন্দ-
অপছন্দ এবং বিবাহ-বিচ্ছেদকালে নারী-পুরুষের সম-অধিকার ও দায়দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। তথ্য মতে ২০১১-এর ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৪৮তম সিডও অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকার সিডও বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল। বিশ্ব নারী দিবসকে সামনে রেখে নারী সমাজ তাদের প্রতি বিরাজমান সব বৈষম্য শনাক্ত করতে পেরেছিল এবং সেই বৈষম্যের ক্ষতিকর দিক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য জোর দাবি তুলেছিল। পরবর্তী সময়ে তারই প্রতিফলন ঘটেছে আন্তর্জাতিক ‘সিডও’ সনদের ১৬টি ধারায়; যদিও নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ন দুটি ধারার ওপর থেকে সরকার এখনো সংরক্ষণ তুলে নেয়নি, বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। সমতা, উন্নয়ন, ও শান্তি, যা আজও নারী প্রগতির আন্দোলনে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। আজও বিশ্বের  প্রায় প্রতিটি দেশে নারী বৈষম্যের শিকার, দেশীয় রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠানে নারীকে অধস্তন করে রাখার প্রবণতা বিরাজমান; যদিও যুগে যুগে নারী প্রগতির আন্দেলনের পথ ধরে অর্জনও কিছু কম হয়নি। ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছে, দাস প্রথার অবসান ঘটেছে, আট ঘন্টা কাজের সময় মেনে নেয়া হয়েছে, নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনা ও উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্য সেবা সরকারিভাবে দেওয়ার ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে, সেই সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়েছে নারী শিক্ষা। নারীকে রাজনৈতিক সচেতন ও নারীর কর্মসংস্থানের ব্যাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ে নারীর শক্তিশালী আন্দোলন জাতিসংঘের এই ব্যবস্থাগুলো এগিয়ে নিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এতকিছু অর্জনের পরও কোথায় যেন একটা ফাঁকা থেকে যায়। সেটা হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। এর ফলে নারীও যে মানবসম্পদ এবং এই অর্ধেক নারীসমাজের কাছে মেধা-মনন-প্রজ্ঞা-দক্ষতা- প্রতিভার অর্ধেকটাই সঞ্চিত থাকে এবং এর যথাযথ ব্যবহার না হলে যে জাতির  জন্য শুভ ও কল্যাণকর কিছু হবে না-সেই সত্য পরিপূর্ণভাবে আমরা হৃদয় দিয়ে এখনো অনুধাবন করিনা। এছাড়া রয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর পিছিয়ে পরা অবস্থানের কারণ প্রতিনিয়ত তাদের নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়া। আমাদের সংবিধানে ‘রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবে ’বলে প্রতিশ্র“তি দেওয়া হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন আদৌ ঘটছে না। সময় এসেছে এই দাবীকে নিছক নারী ইস্যু হিসেবে বিবেচনা না করে গণদাবিতে পরিণত করার। নাগরিক অধিকার ,স্বাধীনসত্তা বিকাশের অধিকার, বাকস্বাধীনতার অধিকার, সম্পত্তিতে সমান অধিকার, অসাম্প্রদায়িক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য যে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম চলছে ও যার ফলে এসেছে আজকের সাফল্যময় সুন্দর দেশ গঠনের দৃপ্ত অঙ্গিকার, তাকে বিবেচনায় রেখেই এগিয়ে যাওয়া। ‘সিডও’ দিবস হোক সেই মানবিক হাতিয়ার শাণিত করার ও নারীকে সমান মর্যাদায় সাথে রেখে দেশ, সমাজ ও বিশ্বকে দেখার দিন। কারণ আমরা জানি, বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের ধারা-উপধারার সঙ্গে সিডও সনদের অনুচ্ছেদ ২ অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ,নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের দাবি অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সিডও ২ ধারা অনুমোদন করা হোক। একই সাথে যৌতুক নিরোধ আইন কার্যকরে এবং বাস্তবায়নে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সমাজ থেকে যৌতুক প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করতে এবং একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে অবশ্যই ‘সিডও’ সনদের পূর্ণ বাস্থবায়নের মাধ্যমে এবং পিতার সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করাটাও অত্যন্ত জরুরী। এছাড়াও নারীবাদী সংগঠনগুলোর উচিত আরো সচেতন ও সক্রিয় হওয়া। কারণ নারীর অধিকার সর্ম্পকে মানুষকে সচেতন করতে হলে সমাজে নারী-পুরুষের প্রচলিত প্রভু-দাসী ভূমিকা বদলের প্রয়োজনই প্রথমত জরুরী। আইনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অসমতা ও নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা শুধু নারী সমাজের প্রতি হুমকিস্বরুপ নয়, বাংলাদেশের জাতীয় অগ্রগতিতে বিরাট প্রতিবন্ধক। নারী ও পুরুষ একে অপরের সহযোগী, উভয়ই সমানভাবে মানুষ এবং অধিকারের ক্ষেত্রে কোন তফাৎ নেই। সমাজ সভ্যতার যতোটা অগ্রগতি হয়েছে তাতে নারী-পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর তাই, সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এনে আনতে হবে। সমাজের সব ক্ষেত্রে এইরুপ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিষ্ঠাই এখন সময়ের দাবী।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here