রাজনৈতিক জোটে সংহতির অভাব দু-একটি বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সার্বিক কার্যক্রম

5
680
আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক জোটগুলোতে। আছে সংহতিরও অভাব। রয়েছে সমন্বয়হীনতা। দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বে দুটি বড় জোট রাজনীতির মাঠে থাকলেও কার্যত তারা নির্বাচনী জোটেই পরিণত হয়েছে। তবে কখনও কখনও জোট নেতারা নিজেদের মধ্যে দু-একটি বৈঠক করেন। এসব বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে দুই জোটের যাবতীয় কার্যক্রম। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যে যার মতো করে পথ চলছে জোট শরিকরা।
এছাড়া রাজনীতির মাঠে বাম প্রগতিশীল ঘরানার এবং ধর্মভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে আরও একাধিক জোট। এদের অবস্থা আরও খারাপ। পাশাপাশি কারও সঙ্গে জোটে নেই-এমন কয়েকটি দলের নেতারা দীর্ঘদিন যাবৎ দফায় দফায় বৈঠক করেও এখনও গঠন করতে পারেনি তাদের জোট। মূলত নিজেদের মধ্যে আস্থাহীনতা আর সংহতির অভাব প্রকট আকার ধারণ করায় এগোতে পারছেন না তারা। আর নামসর্বস্ব দল নিয়ে গঠিত আরও বেশ কয়েকটি জোটে প্রায়ই ভাঙাগড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বুধবার বলেন, ভোটের রাজনীতিকে ঘিরেই মূলত বিভিন্ন সময় নানা জোট গঠিত হয়েছে। ফলে জোটের শরিকরা যতটা না জোটের কর্মকাণ্ড নিয়ে তৎপর, তার চেয়ে বেশি তৎপর ভোট নিয়ে। এখন ভোট নেই, তাই তাদের তৎপরতাও নেই। ভোট এলেই জোটভিত্তিক দলগুলোর তৎপরতা চোখে পড়বে। তিনি আরও বলেন, কোনো আদর্শের ভিত্তিতে এসব জোট গঠিত হয় না। যে কারণে এসব জোটের শরিকদের মধ্যে পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব কাজ করে। অপ্রাপ্তি থেকে হতাশা ভর করে। আস্থাহীনতা, এমনকি সংহতিরও অভাব প্রকট আকার ধারণ করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই। যার ফলে জোট, এমনকি দলগুলোতে ভাঙাগড়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। প্রথম মেয়াদে শরিকদের মধ্য থেকে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়–য়াকে শিল্পমন্ত্রী করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ ছিল ১৪ দলীয় জোটের বাকি শরিকরা। ক্ষমতার ভাগ না পাওয়ার ব্যথা মনে মনে ধারণ করে পথ চললেও প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি তারা। তবে আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় তাদের ক্ষোভের বিষয়টি নানা সময় প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ তাদের দুই প্রধান শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রী বানায়। এ দফায়ও ন্যাপ (মোজাফফর), গণতন্ত্রী পার্টিসহ বঞ্চিত দলগুলো ক্ষুব্ধ হয়। মাঝে মধ্যে সেই ক্ষোভের প্রকাশ তারা ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে প্রকাশ করেন সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনার মধ্য দিয়ে।
এ প্রসঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বুধবার বলেন, ‘আমাদের দেশে জোটগত রাজনীতির বিকাশ সেভাবে এগোচ্ছে না বলেই নানা ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। তারপরও এটা সত্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট অনেক বেশি সংহত। বাকি জোটগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।’
সূত্র জানায়, একই অবস্থা মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটেও। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা এই দলটির অন্যতম প্রধান শরিক হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুতে বিএনপি প্রথম থেকেই নীরব। এ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী আগাগোড়া ক্ষুব্ধ বিএনপির ওপর। যার প্রভাব পড়ে সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে। অধিকাংশ স্থানে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি প্রার্থীদের জামায়াতকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। এ নিয়ে বেড়েছে দুই দলের দূরত্ব। দলের শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে আজ দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে জামায়াত। কিন্তু বিএনপি এতে সমর্থন দেয়নি। অতীতেও বিএনপির আন্দোলনে জামায়াতকে কিংবা জামায়াতের আন্দোলনেও বিএনপিকে সেভাবে মাঠে দেখা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বুধবার বলেন, ‘আমাদের দেশে জোট হয় মূলত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এখানে আদর্শ মুখ্য থাকে না। আদর্শটা এখন বিরল। এখানে একটাই লক্ষ্য থাকে আর তা হচ্ছে- কার সঙ্গে জোট করলে লাভবান হব, টাকা-পয়সা পাব। দেখা যাচ্ছে ভোটের রাজনীতিকে মাথায় রেখে বিপরীত চিন্তার দলগুলো এক ছাতার নিচে সমবেত হচ্ছে, আবার স্বার্থে আঘাত লাগলে আলাদাও হয়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, রাজনীতিটা রাজনীতির জায়গায় নেই। রাজনীতি স্বার্থের জায়গায় চলে গেছে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, জোট প্রকৃত অর্থে কার্যকর না হওয়ার পেছনে উল্লিখিত সব কারণ ছাড়াও রয়েছে জোটের ভেতরে ভাঙাগড়া। নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায় প্রয়াত শেখ শওকত হোসেন নিলুর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। অন্যদিকে এনপিপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নিজেই দলের প্রধান হয়ে ২০ দলীয় জোটে থেকে যান। শেখ শওকত হোসেন নিলু বিএনপি থেকে বেরিয়ে নিজেই আলাদা একটি জোট করেন। পরে অবশ্য সেই জোটও টেকেনি। একইভাবে ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায় ইসলামিক পার্টি। আবদুল লতিফ নেজামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্যজোটও ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে নিজেরাই আলাদা একটি জোট গঠন করে। যদিও অ্যাডভোকেট রকিব উদ্দিনের নেতৃত্বে ইসলামী ঐক্যজোট নামে একটি ক্ষুদ্র অংশ রয়েছে ২০ দলীয় জোটেই।
বিএনপির সাবেক নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে একটি জোট গঠিত হয়েছে সম্প্রতি। জোট গঠনের কিছুদিনের মাথায় আবার এটি ভেঙেও গেছে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ সমমনা আরও কয়েকজন মিলে যুক্তফ্রন্ট নামে একটি জোট গঠন করেন। নির্বাচনের পর সেই জোট ভেঙে যায়। সম্প্রতি তারা দুই বড় দলের বাইরে তৃতীয় একটি জোট গঠনের আশাবাদের কথা শোনালেও এখন পর্যন্ত কোনো সুখবর দিতে পারেননি। গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার ব্যানারে বাম ঘরানার কয়েকটি দল মাঠে থাকলেও সংহতির অভাব থাকায় এই জোটেও কোনো সুখবর নেই।
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here