মব সন্ত্রাসের বিচার কেন হয় না

এস এম আওলাদ হোসেন
আইনের শাসন যেখানে দুর্বল, সেখানে জনতার শাসন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ‘মব সন্ত্রাস’ বা জনতার সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সন্দেহভাজন অপরাধী, চোর, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক বিরোধী—অনেক ক্ষেত্রেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জনতা ন্যায়বিচারের নামে নির্মম সহিংসতায় লিপ্ত হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এত ঘটনার পরও মব সন্ত্রাসের কার্যকর বিচার কেন হয় না ?
প্রথমত, অপরাধীর সমষ্টিগত পরিচয় বিচারকে জটিল করে তোলে। মব সন্ত্রাসে নির্দিষ্ট অপরাধীকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়, কারণ সহিংসতা চালায় একাধিক ব্যক্তি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রায়ই “অজ্ঞাতনামা জনতা” বলে মামলা দায়ের করে, যার ফলে তদন্ত দুর্বল হয় এবং শেষ পর্যন্ত মামলা ঝুলে যায়।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বড় বাধা। অনেক সময় মবের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক কর্মী বা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এতে করে প্রশাসন ও তদন্ত সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রাজনৈতিক চাপ বা ‘সমঝোতার সংস্কৃতি’ বিচার প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেয়।
তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগে শিথিলতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব মব সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করে। যখন বারবার দেখা যায়, জনতার হাতে মানুষ নিহত হলেও অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যায়, তখন সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে—আইনের বাইরে গিয়েও পার পাওয়া সম্ভব।
চতুর্থত, দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষ্য সংকট বিচারকে দুর্বল করে। ভুক্তভোগী পরিবার প্রায়ই ভয়, হুমকি কিংবা সামাজিক চাপে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসে না। আবার তদন্ত ও বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ায় ন্যায়বিচারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মব সন্ত্রাসকে অনেক সময় সামাজিকভাবে ‘ন্যায্য’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অপরাধ দমনের নামে জনতার বিচারকে কেউ কেউ সমর্থন করে, যা আইনের শাসনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। রাষ্ট্র যদি বিচার করবে না—এই ধারণাই মব সন্ত্রাসের মূল পুষ্টি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ। মব সন্ত্রাসকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীদের শনাক্ত, তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য। একই সঙ্গে নাগরিকদের বোঝাতে হবে—ন্যায়বিচার জনতার হাতে নয়, আইনের হাতেই নিরাপদ।
মব সন্ত্রাসের বিচার না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু ভুক্তভোগী নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি। আইন যখন নীরব থাকে, তখন সহিংসতাই কথা বলে—আর সেটাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।



