এনসিটি ইজারার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল সোমবারও কর্মবিরতির ঘোষণা

মুহাম্মদ জুবাইর
চট্টগ্রাম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক ও কর্মচারীরা।রোববার সকাল থেকে টানা আট ঘণ্টার কর্মবিরতির ফলে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও খোলা পণ্য ওঠানামার কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে কার্যত অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
কর্মবিরতির কারণে বন্দরে পণ্য ডেলিভারির জন্য কভার্ড ভ্যান, লরি ও ট্রেলার প্রবেশ বন্ধ থাকে। ফলে বন্দরের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো প্রায় ফাঁকা থাকলেও বহির্গেটে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে দেখা যায় পরিবহন শ্রমিক ও চালকদের। পণ্য ওঠানামা বন্ধ থাকায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
দাবি আদায় না হওয়ায় সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আবারও কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে আন্দোলন আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে।
এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গত দুই দিনে চট্টগ্রাম বন্দরের ১১ জন কর্মচারীকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। সর্বশেষ ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনেল অফিসারের সই করা এক আদেশে সাতজন কর্মচারীকে জরুরি দাপ্তরিক ও অপারেশনাল প্রয়োজনে বদলি করা হয়।
বদলি হওয়া সাতজন হলেন পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মোহাম্মদ শফি উদ্দিন ও রাশিদুল ইসলাম, পরিকল্পনা বিভাগের স্টেনো টাইপিস্ট মো. জহিরুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের এসএস পেইন্টার হুমায়ুন কবির, প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী মো. শাকিল রায়হান, যান্ত্রিক বিভাগের ইসিএম ড্রাইভার মানিক মিঝি এবং প্রকৌশল বিভাগের মেসন মো. শামসু মিয়া। তাদের মধ্যে চারজনকে ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপোতে এবং তিনজনকে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে।
এর আগে, গত ৩১ জানুয়ারি কর্মবিরতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে আরও চার কর্মচারীকে বদলি করা হয়। তারা হলেন—অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির, নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন, অর্থ ও হিসাব বিভাগের উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম এবং প্রকৌশল বিভাগের এসএস খালাসী মো. ফরিদুর রহমান। তাদের মধ্যে প্রথম দুজন বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক এবং অপর দুজন সংগঠনটির নেতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বার্থ অপারেটর জানান, রোববার বন্দরের কোনো জেটিতেই শ্রমিক বুকিং দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো জাহাজে কনটেইনার বা পণ্য ওঠানামার কাজ হয়নি। সোমবারও একই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
একাধিক পরিবহন মালিক ও চালক বলেন, ‘কর্মবিরতির কারণে বন্দরে পণ্য ওঠানামা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আমরা পণ্য ডেলিভারি করতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। গাড়ি বন্দরের ভেতরে ঢুকতে না পারায় গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
প্রথম দিনের কর্মবিরতির পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে জড়িত চারজনকে চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক বদলির পাশাপাশি এক দিনের কর্মবিরতিতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।
এদিকে, আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) শনিবার রাত ১২টা থেকে পরবর্তী এক মাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। নিষেধাজ্ঞার পর শনিবার রাতে আন্দোলনকারীরা বন্দর এলাকায় মিছিল করলেও রোববার কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচি পালন করেননি।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘দুই দিনের কর্মসূচির পরও সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। উল্টো আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বদলি করা হচ্ছে। এতে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।
অপর সমন্বয়ক ও শ্রমিকদল নেতা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচিতে সব জেটির কাজ বন্ধ ছিল। শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই কোনো মিছিল বা সমাবেশ করছি না। এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে না।



