বিষাক্ত চক্রে পিষ্ট জনজীবন: হাসপাতাল ও আদালতের বারান্দায় এক অসহায় দৌড়

একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার সুস্বাস্থ্য এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের সমাজ যেন এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে। একদিকে ভেজাল ও বিষাক্ত খাবারের মহোৎসব, অন্যদিকে নিম্নমানের বা নকল ওষুধের দৌরাত্ম্য—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের গন্তব্য এখন কেবল দুটি জায়গায় সীমাবদ্ধ: *হাসপাতাল* এবং *আদালত*।
১. বিষাক্ত খাবার: থালায় যখন মরণব্যাধি
বেঁচে থাকার জন্য আমরা খাই, কিন্তু এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—আমরা কি বাঁচার জন্য খাচ্ছি না কি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? চাল থেকে ডাল, মাছ থেকে সবজি—সবখানেই রাসায়নিকের ছোঁয়া।
* *ফরমালিন ও কীটনাশক:* অসাধু ব্যবসায়ীরা পচন রোধে খাবারে মেশাচ্ছে বিষাক্ত ফরমালিন। সবজিতে ব্যবহার করা হচ্ছে অতিরিক্ত মাত্রার কীটনাশক।
* *ভেজাল ও রঙ:* মশলায় ইটের গুঁড়ো, মিষ্টিতে বিষাক্ত রঙ এবং দুধে রাসায়নিকের মিশ্রণ এখন ডাল-ভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর ফলে ঘরে ঘরে আজ ক্যান্সার, কিডনি অকেজো হওয়া এবং লিভারের সমস্যার মতো প্রাণঘাতী রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে।
### ২. ওষুধের নামে বিষ ও অসুস্থ জাতি
খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে মানুষ যখন একটু সুস্থতার আশায় ওষুধের শরণাপন্ন হয়, সেখানেও ওত পেতে আছে ভয়ংকর প্রতারণা।
* *নকল ও নিম্নমানের ওষুধ:* বাজারে জীবন রক্ষাকারী অনেক ওষুধই এখন নকল বা মানহীন।
* *অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স:* ভুল ও অতিরিক্ত ওষুধের প্রয়োগে মানুষের শরীর ওষুধের কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
মানুষের অসুস্থতা আজ এক শ্রেণীর মানুষের কাছে কেবলই ‘ব্যবসা’। সুস্থ হওয়ার বদলে মানুষ আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছে, যার ফলে হাসপাতালের বারান্দায় দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হচ্ছে।
### ৩. আদালত ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা
যখন কোনো নাগরিক এই খাদ্যে ভেজাল বা চিকিৎসার অবহেলার শিকার হন, তখন শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু সেখানেও এক অন্তহীন প্রতীক্ষা।
* *মামলার জট:* বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলার ভিড়ে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
* *হয়রানি:* আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে সাধারণ মানুষ বিচার পাওয়ার আগেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
### ৪. দৌড়ের ওপর থাকা এক জাতি: ফলাফল ও প্রভাব
হাসপাতাল এবং আদালত—এই দুই বারান্দার দৌড়াদৌড়ি একটি জাতির জীবনীশক্তি এবং অর্থনীতিকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
1. *অর্থনৈতিক বিপর্যয়:* চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দরিদ্র হয়ে পড়ছে।
2. *মেধাশূন্যতা:* অসুস্থ শরীর ও মন নিয়ে একটি জাতি কখনোই উদ্ভাবনী বা সৃজনশীল হতে পারে না।
3. *আস্থাহীনতা:* যখন মানুষ খাবার এবং ওষুধকে ভয় পায়, তখন সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।
### উপসংহার
বিষাক্ত খাবার এবং ওষুধের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে কেবল আইন করলে চলবে না, প্রয়োজন কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা। ব্যবসায়িক মুনাফার চেয়ে জীবনের মূল্য যে অনেক বেশি, এই বোধ জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালের ভিড় কমবে না। আমাদের এখনই এই “বিষচক্র” ভাঙতে হবে, অন্যথায় আগামী প্রজন্ম কেবল হাসপাতালের বিছানায় আর আদালতের বারান্দায় মাথা খুঁড়েই শেষ হয়ে যাবে। *সুস্থ সবল জাতি গঠন কোনো বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার অধিকার।*



