কম্পিউটার বিজ্ঞানী শহিদুজ্জামান বাপ্পীর জন্য শুভকামনা

বিল্লাল বিন কাশেম: মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক থাকে, যা কেবল আত্মীয়তার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো হয়ে ওঠে আত্মার বন্ধন, বিশ্বাসের জায়গা, দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক অনন্য সমীকরণ। আমার ছোট ভাই, জার্মানি ও রোমানিয়া প্রবাসী কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও প্রখ্যাত সফটওয়্যার প্রকৌশলী শহিদুজ্জামান বাপ্পীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঠিক তেমনই এক আবেগময় ও আত্মিক সম্পর্কের নাম। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা পেরিয়ে আগামী ২৫ মে ২০২৬ তারিখে সে দেশে ফিরছে—এই সংবাদটি আমার হৃদয়ে এক অন্যরকম আনন্দের সুর তুলেছে।
আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর একটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট কেন্দ্রিক সেই দিনগুলো। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকি। হলের ১৭৮ ও ২ নম্বর রুমে কত মানুষ যে এসেছে, কত স্বপ্ন, কত রাজনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি আর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়েছে—তার হিসাব নেই। বাপ্পী তখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ছে। মাঝেমধ্যেই সে হলে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতো। তার চোখে ছিল এক ধরনের স্বপ্নময় দীপ্তি। প্রযুক্তি নিয়ে তার ভাবনা, সফটওয়্যার নিয়ে তার পরিকল্পনা, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কল্পনা—সবকিছুই ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
তখন বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাত এতটা বিস্তৃত হয়নি। ইন্টারনেট ছিল সীমিত, ডিজিটাল প্রযুক্তি ছিল কেবল সম্ভাবনার আলো। কিন্তু বাপ্পীর মতো তরুণেরা তখনই বুঝে গিয়েছিল, ভবিষ্যতের পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভর হতে যাচ্ছে। সে নানা ধরনের সফটওয়্যার তৈরি করতো, নতুন নতুন অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতো। আমি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকায় তার তৈরি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের খবর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করতাম। আজ ভাবলে বিস্মিত হই—সেই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই একসময় তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
পরবর্তীকালে ডিজিটাল ডিকশনারি, ভাষাভিত্তিক সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন আধুনিক অ্যাপ তৈরি করে সে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রযুক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার যে প্রয়াস, সেটি তার কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, প্রযুক্তিকে মানুষের উপকারে লাগানোর চিন্তাটিই তাকে আলাদা করে তুলেছে।
আমরা প্রায়ই দেখি, বিদেশে গিয়ে অনেকেই নিজের শেকড় ভুলে যায়। কিন্তু বাপ্পীর মধ্যে আমি কখনো সেই পরিবর্তন দেখিনি। জার্মানি ও রোমানিয়ার মতো উন্নত দেশে দীর্ঘ সময় বসবাস করেও সে ভেতরে ভেতরে একজন গভীর দেশপ্রেমিক মানুষ। বাংলাদেশের কথা সে সবসময় ভাবে। দেশের তরুণদের নিয়ে ভাবে। প্রযুক্তিখাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলে। তার বিশ্বাস—সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশও একদিন প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—খুলনা অঞ্চলের মধ্যে বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণকারীদের অন্যতম হিসেবে তার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু এই অর্জন তাকে অহংকারী করেনি। বরং আরও বিনয়ী করেছে। তার ভেতরে এখনো সেই সহজ-সরল ছেলেটিকে খুঁজে পাওয়া যায়, যে একসময় বুয়েট থেকে এসে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছোট্ট রুমে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা বলতো।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাপ্পী এক গভীর আবেগের নাম। পৃথিবীতে সব সম্পর্ক রক্তের কারণে গভীর হয় না; কিছু সম্পর্ক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও নির্ভরতার কারণে বিশেষ হয়ে ওঠে। সে আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে ও সম্মান করে। এমন খুব কম দিন গেছে, যেদিন আমাদের কথা হয়নি। দূরত্ব আমাদের যোগাযোগ কমাতে পারেনি। প্রযুক্তির যুগে হাজার মাইল দূর থেকেও মানুষের হৃদয় কতটা কাছাকাছি থাকতে পারে, আমাদের সম্পর্ক তার একটি উদাহরণ।
জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমি অসংখ্য মানুষের স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছি। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করতে গিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের ভালোবাসা আলাদা করে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। বাপ্পীর আন্তরিকতা আমার কাছে তেমনই এক আশীর্বাদ।
বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে আমরা দেখি, জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ একে অপরের পরিপূরক। একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বড় হন না; তিনি বড় হন মানবিকতায়, সংস্কৃতিবোধে, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতায়। বাপ্পীর মধ্যে আমি সেই মানবিক শিক্ষার প্রতিফলন দেখি। বিদেশে থেকেও সে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছে।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যম নয়; এটি সাংস্কৃতিক শক্তিরও অংশ। একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার প্রযুক্তিবিদরা কেবল যন্ত্র তৈরি করেন না, মানুষের জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন দেখেন। বাপ্পীর কাজের মধ্যে আমি সেই স্বপ্ন দেখি। ডিজিটাল ডিকশনারির মতো উদ্যোগ বাংলা ভাষাকে প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। ভাষা ও প্রযুক্তির এই সমন্বয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য বাপ্পী এক অনুপ্রেরণার নাম হতে পারে। কারণ তার জীবনের গল্পে আছে অধ্যবসায়, মেধা, সংগ্রাম এবং আত্মবিশ্বাসের এক অনন্য সমন্বয়। তিনি প্রমাণ করেছেন—বাংলাদেশের একজন তরুণও বিশ্বমানের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারে।
আজ যখন দেশ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন আমাদের প্রয়োজন এমন মানুষ, যারা জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সততার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। বাপ্পী সেই সম্ভাবনাময় প্রজন্মের প্রতিনিধি। তিনি শুধু একজন সফল প্রবাসী নন; তিনি বাংলাদেশের এক মূল্যবান সম্পদ।
তার দেশে ফেরা আমার কাছে শুধুই পারিবারিক আনন্দ নয়; এটি যেন স্মৃতির পুনর্জাগরণ। আমরা আবার হয়তো দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়াবো, পুরোনো দিনের কথা বলবো, নতুন স্বপ্নের কথা ভাববো। হয়তো কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হবে। হয়তো কোনো চায়ের দোকানে বসে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্প ফিরে আসবে।
মানুষ শেষ পর্যন্ত স্মৃতির কাছেই ফিরে যায়। শেকড়ের কাছেই ফিরে আসে। পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, নিজের মাটি, নিজের মানুষ, নিজের ভাষা—এসবের টান কখনো শেষ হয় না। বাপ্পীর ভেতরেও আমি সেই মাটির টান অনুভব করি।
আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করি—আল্লাহ তাকে সুস্থ রাখুন, দীর্ঘায়ু দান করুন এবং তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপকে কল্যাণময় করুন। তার জ্ঞান, মেধা ও অভিজ্ঞতা যেন দেশ ও মানুষের কাজে আসে। সে যেন আরও বড় পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে।
স্বাগতম প্রিয় ভাই, স্বাগতম মাতৃভূমিতে। তোমার আগমন হোক আনন্দ, ভালোবাসা ও নতুন স্বপ্নের সূচনা।
বিল্লাল বিন কাশেম
কবি, লেখক ও গল্পকার
bbqif1983@gmail.com



