অনুসন্ধানঅপরাধএক্সক্লুসিভচট্টগ্রামবাংলাদেশ

বায়েজিদে ফের ত্রাসের রাজত্ব: হত্যা-অস্ত্র-ডাকাতিসহ অসংখ্য মামলার আসামি রবিউল শেখের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী, বালুছড়া, অক্সিজেন, ছিন্নমূল এলাকা ও আমিন জুট মিল সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় আবারও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে আলোচিত সন্ত্রাসী ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি রবিউল শেখ। হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, মারামারি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত এই ব্যক্তিকে ঘিরে এখন পুরো এলাকায় বিরাজ করছে চরম ভীতি ও উৎকণ্ঠা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, “রবিউল শেখের প্রধান পেশাই যেন মানুষ হত্যা করা। কথায় কথায় অস্ত্র বের করা, হামলা চালানো, গুমের হুমকি দেওয়া তার কাছে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।” এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হয়ে সে আবারও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রধারী বাহিনী।

অভিযোগ রয়েছে, রবিউল শেখের কাছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় ও বিদেশি অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। তার অনুসারীরা প্রকাশ্যে মহড়া দেয়, গভীর রাতে মোটরসাইকেল শোডাউন করে এবং ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করে। কেউ প্রতিবাদ করলেই হামলা, গুম কিংবা হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

এলাকাবাসী আরও জানান, বালুছড়া, অক্সিজেন, ছিন্নমূল এলাকা, আমিন জুট মিলসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে তার কিশোর গ্যাং সদস্যরা প্রকাশ্যে বিচরণ করছে। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোরদের টাকার লোভ দেখিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে করে এলাকার তরুণ সমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। কারণ, সে যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে। তার বাহিনীর হাতে অনেক নিরীহ মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রবিউল শেখের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন থানায় একাধিক গুরুতর মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অস্ত্র আইনের কয়েকটি মামলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে এখনো চলমান রয়েছে।

২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সিএমপির ডবলমুরিং মডেল থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় তাকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। এফআইআর নং-১৫ ও জিআর নং-১৮২ নম্বরের ওই মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩০২/১০৯/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আলোচিত “মাসুদ মার্ডার” ঘটনার পর থেকেই তার নাম নতুন করে আলোচনায় আসে।

এছাড়া ২০২২ সালের ২১ আগস্ট বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় হত্যাচেষ্টা, গুরুতর জখম, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। মামলার এফআইআর নং-৩৮/৩০৯ এবং জিআর নং-৩০৯। দণ্ডবিধির ৩০৭/৩২৬/৩২৩/৩২৪/৪২৭/৫০৬/১৪৩ ধারায় দায়ের হওয়া ওই মামলায় ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি চার্জশিট দাখিল করা হয়।

২০১৯ সালের ১২ জানুয়ারি পাঁচলাইশ মডেল থানায় দায়ের হওয়া অস্ত্র আইনের মামলাতেও তার নাম উঠে আসে। মামলার এফআইআর নং-১২/১২। এতে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ১৯-এ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া হয়।

এছাড়া ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের হওয়া অস্ত্র মামলায় তার বিরুদ্ধে ১৯-এ ও ১৯(এফ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের ১৫ মার্চ বায়েজিদ বোস্তামী থানায় দায়ের হওয়া আরও একটি অস্ত্র মামলাতেও সে অভিযুক্ত।

স্থানীয়দের দাবি, রবিউল শেখ শুধু একজন সন্ত্রাসী নয়, বরং পুরো এলাকায় একটি ভয়ংকর অপরাধ চক্র পরিচালনা করছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কেউ মামলা করলেও পরে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকির কারণে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।

এলাকাবাসী বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আবারও বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটতে পারে। তার বাহিনীর কারণে পুরো এলাকায় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল করিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সচেতন মহলের দাবি, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে রবিউল শেখ ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button