
মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামে জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে আটক, শারীরিকভাবে হেনস্তা এবং পরে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় দলের একজন সক্রিয় ক্রিকেটারের মুখে এমন অভিজ্ঞতার বর্ণনা প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে ক্রীড়াঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নাঈম হাসানের অভিযোগ, নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে ‘আসামি’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়, গলা চেপে ধরা হয় এবং সাদা পোশাকধারী এক ব্যক্তির মারধরেরও শিকার হন তিনি। অন্যদিকে, ঘটনার প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতির ইঙ্গিত পাওয়ার কথা স্বীকার করে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
নাঈম হাসান জানান, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার জন্য নির্ধারিত ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ায় তিনি রাত সোয়া ১১টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দর থেকে বাসার উদ্দেশ্যে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় রওনা দেন তিনি। রাত আনুমানিক ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে পৌঁছালে কয়েকজন ব্যক্তি তার অটোরিকশার গতিরোধ করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচয় না দিয়েই তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন। একই সঙ্গে অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। কী কারণে তাকে আটক করা হচ্ছে জানতে চাইলে কেউ কোনো ব্যাখ্যা দেননি। বরং তাকে জোরপূর্বক অন্য একটি সিএনজিতে তোলার চেষ্টা করা হয়।
নাঈমের অভিযোগ, এ সময় তার গলা চেপে ধরা হয় এবং তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। পরে তিনি জানতে পারেন ঘটনাস্থলে দুইজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে থাকা সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত এক ব্যক্তি তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, তিনি বারবার তার বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তাকে সেই সুযোগও দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে তিনি চিৎকার শুরু করলে আশপাশের মানুষজন এগিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে শতাধিক লোক ঘটনাস্থলে জড়ো হয়। অনেকেই তাকে চিনতে পারেন এবং তার সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদ জানান।
নাঈম বলেন, “আমি আমার পরিচয় দিয়েছি, জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচয়পত্র দেখিয়েছি। কিন্তু তারপরও তারা আমাকে আসামি বলে সম্বোধন করেছে। আমাকে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। আমি বারবার জানতে চেয়েছি আমার অপরাধ কী, কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি।”
তার দাবি, পরে তাকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় পৌঁছানোর পরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তাকে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলা হয় এবং শুরুতে অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়। পরে উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি এবং ক্রিকেটাঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের ফোন আসার পর আচরণে পরিবর্তন আসে।
নাঈম হাসান বলেন, “আজ মানুষ আমাকে চিনেছে বলেই বিষয়টি সামনে এসেছে। আমি জাতীয় দলের ক্রিকেটার বলেই অনেকেই এগিয়ে এসেছে। কিন্তু আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে হয়তো তার খোঁজই কেউ পেত না। এই অভিজ্ঞতা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে।”
এদিকে নাঈমের বাবা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলম অভিযোগ করে বলেন, ছেলেকে থানায় নেওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত খুলশী থানায় ছুটে যান। কিন্তু প্রথমদিকে তাকে থানায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে তিনি থানায় ঢোকার সুযোগ পান।
মাহবুব আলমের দাবি, জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও তার ছেলেকে অপমান করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, থানায় উপস্থিত কর্মকর্তারা শুরুতে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নেননি। পরে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যোগাযোগ করার পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং ভুল স্বীকারের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, “আমার ছেলে একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তার সঙ্গে যদি এমন আচরণ করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আমি এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই।” নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক তাৎক্ষণিক এক ব্যক্তি বলেন খুলশী থানার ওসি সন্ত্রাসীদের লালন পালনকর্তা তিনি ওসি নামের কলঙ্ক
ঘটনার পর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নাঈম হাসানের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয়ে আমরা কাজ করছি। তাই কোনো অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার বরদাশত করা হবে না। তদন্তে যেই দায়ী হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ডিসি আমিরুল ইসলাম স্বীকার করেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা এখন কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ, নাগরিক অধিকার এবং জবাবদিহিতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে ক্রীড়াঙ্গনসহ পুরো দেশ।



