দেশপ্রশাসন

নাঈম কাণ্ডে নড়েচড়ে বসল সিএমপি, বিভাগীয় মামলার মুখে তিন পুলিশ সদস্য

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামে জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে আটক, শারীরিকভাবে হেনস্তা এবং পরে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে সিএমপি।

শুক্রবার (১৩ জুন) সিএমপি সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান রাত ১টার দিকে ঢাকা থেকে নিজ বাসায় ফেরার পথে খুলশী থানাধীন লালখান বাজার এলাকায় খুলশী থানার রাত্রীকালীন মোবাইল টিমের সঙ্গে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হন। ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট এসআই (নিরস্ত্র) মো. শফিকুল ইসলাম ভূইয়া ও কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এর আগে নাঈম হাসান অভিযোগ করেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাসায় যাওয়ার পথে লালখান বাজার এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি তার বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার গতিরোধ করেন। তারা নিজেদের পরিচয় না দিয়েই তাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন এবং চালকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে নেন।

নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি কারণ জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দেওয়া হয়নি। বরং তাকে জোরপূর্বক অন্য একটি সিএনজিতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তার গলা চেপে ধরা হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে থাকা সাদা পোশাকধারী একজন ব্যক্তি তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, “আমি বারবার নিজের পরিচয় দিয়েছি, জাতীয় দলের খেলোয়াড় হিসেবে পরিচয়পত্র দেখিয়েছি। কিন্তু তারপরও আমাকে ‘আসামি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আমি আমার বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করলেও আমাকে বাধা দেওয়া হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমি চিৎকার করলে আশপাশের মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেন। অনেকেই আমাকে চিনতে পারেন এবং প্রতিবাদ জানান। মানুষ আমাকে চিনেছিল বলেই হয়তো বিষয়টি এতদূর এসেছে। আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে তার কী হতো সেটি ভেবেই শঙ্কা লাগে।”

নাঈমের দাবি, পরে তাকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় নেওয়ার পরও শুরুতে তার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করা হয়। তবে উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন ব্যক্তি ও ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের ফোন আসার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।

এদিকে নাঈমের বাবা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলম অভিযোগ করেন, ছেলেকে থানায় নেওয়ার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত খুলশী থানায় গেলেও প্রথমদিকে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে তিনি থানায় প্রবেশের সুযোগ পান।

মাহবুব আলম বলেন, “জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে যদি এমন আচরণ করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”

ঘটনার পর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নাঈম হাসানের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে এবং কেউ দায়ী প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার বা দায়িত্ব পালনে অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। তদন্তে যেই দায়ী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ডিসি আমিরুল ইসলাম আরও জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি এখন কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহিতা এবং পুলিশি দায়িত্ব পালনের মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযুক্ত দুই সদস্যকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে পুলিশ প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা কী হয়, সেদিকেই এখন নজর ক্রীড়াঙ্গনসহ দেশবাসীর।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button