প্রশাসন

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ ঘিরে ‘রেড অ্যালার্ট’ প্রস্তুতি, মাঠে সিএমপির সোয়াত ও বোম্ব স্কোয়াড

মুহাম্মদ জুবাইর: চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। আগামী ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচকে সামনে রেখে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট এক বিশেষ নিরাপত্তা মহড়ার আয়োজন করেছে। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সম্ভাব্য যেকোনো ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই এবং বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাই ছিল এই মহড়ার মূল উদ্দেশ্য। বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই ম্যাচ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে বিপুল সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, ম্যাচ অফিসিয়াল, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এসব বিষয় মাথায় রেখে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই বিশেষ মহড়া পরিচালনা করা হয়। মহড়ায় অংশগ্রহণ করে সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের বিশেষায়িত সোয়াত (SWAT) টিম, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং কে-৯ (K-9) ইউনিট। প্রতিটি ইউনিট তাদের নিজ নিজ দক্ষতা ও সক্ষমতার প্রদর্শনের পাশাপাশি সমন্বিতভাবে সংকট মোকাবিলার বিভিন্ন অনুশীলন পরিচালনা করে। মহড়ার শুরুতেই সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলার একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। সেখানে দেখা যায়, স্টেডিয়ামের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েকজন ব্যক্তি জিম্মি অবস্থায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে জিম্মিদের নিরাপদে উদ্ধার করতে হয়, তার বাস্তবসম্মত প্রদর্শন করে সোয়াত সদস্যরা। অত্যাধুনিক অস্ত্র ও কৌশল ব্যবহার করে তারা কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং জিম্মিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া প্রদর্শন করে। এ সময় উপস্থিত কর্মকর্তারা সোয়াত সদস্যদের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৌশলগত অবস্থান গ্রহণ, সমন্বিত অভিযান পরিচালনা এবং সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতার প্রশংসা করেন। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এমন বিশেষায়িত ইউনিটের প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন তারা। মহড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের কার্যক্রম। স্টেডিয়ামের অভ্যন্তরে সন্দেহজনক একটি বস্তু পাওয়ার পর সেটিকে ঘিরে কীভাবে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়, দর্শক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিস্ফোরক শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করা হয়, তার বিস্তারিত প্রদর্শন করা হয়। বিশেষজ্ঞ সদস্যরা রোবোটিক সরঞ্জাম ও বিশেষ ডিটেকশন যন্ত্র ব্যবহার করে বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণের বিভিন্ন ধাপ প্রদর্শন করেন। এছাড়া কে-৯ ইউনিটের প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড স্টেডিয়ামের বিভিন্ন গ্যালারি, ড্রেসিং রুম, ভিআইপি বক্স, মিডিয়া সেন্টার এবং আশপাশের এলাকায় বিস্ফোরক ও সন্দেহজনক বস্তু অনুসন্ধানের মহড়া পরিচালনা করে। প্রশিক্ষিত কুকুরগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নির্ধারিত এলাকাগুলো তল্লাশি করে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু শনাক্ত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কে-৯ ইউনিট অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। মহড়ায় আরও দেখানো হয়, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে দর্শকদের দ্রুত ও নিরাপদে স্টেডিয়াম থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে, কীভাবে ভিআইপি অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো দুর্ঘটনা বা নাশকতার ঘটনা ঘটলে বিভিন্ন ইউনিট কীভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করবে। এ ধরনের অনুশীলনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের প্রস্তুতি যাচাইয়ের পাশাপাশি দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা দ্রুত সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ম্যাচ উপলক্ষে স্টেডিয়াম ও এর আশপাশে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হবে। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ সদস্য, সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য, ট্রাফিক পুলিশ ও বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট মোতায়েন থাকবে। স্টেডিয়ামে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর তল্লাশি, আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থা এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর বিশেষ নজরদারি রাখা হবে।
এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, পার্কিং এলাকা, দর্শক গ্যালারি, ড্রেসিং রুম এবং ভিআইপি জোনকে বিশেষ নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি পরিচালনার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার এই ম্যাচকে ঘিরে যেকোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। দর্শক, খেলোয়াড় এবং সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এই ম্যাচ যেমন একটি বড় ক্রীড়া উৎসব, তেমনি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে রয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। সংশ্লিষ্টদের আশা, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া আন্তর্জাতিক ম্যাচটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button