মানবপাচার চক্রে বিমানের কর্মকর্তা, ভোররাতে সিআইডির অভিযানে গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে জাল শেনজেন ভিসার মাধ্যমে ইতালিতে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মানবপাচার প্রতিরোধে নিয়োজিত সিআইডির টিএইচবি (ট্রাফিকিং ইন হিউম্যান বিংস) ইউনিট পরিচালিত এক অভিযানে জামালপুরের বকশীগঞ্জ এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত কর্মকর্তা হলেন মোহাম্মদ আখলাছুর রহমান (৪০)। তিনি বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সে জুনিয়র অফিসার (গ্রাউন্ড সার্ভিস, আইএনএস গেইট) পদে কর্মরত রয়েছেন। তার স্থায়ী ঠিকানা জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ উপজেলায় এবং বর্তমানে তিনি ঢাকার দক্ষিণখান থানাধীন আশকোনা এলাকায় বসবাস করছিলেন।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি মানবপাচারকারী চক্র বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, ইতালিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ার নামে চক্রটির দুই সদস্য কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে জনপ্রতি ৩০ লাখ টাকা চুক্তি করে। পরে অগ্রিম হিসেবে জনপ্রতি ২০ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
চুক্তি অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের হাতে নেপালগামী ও ইতালিগামী বিমান টিকিট, বোর্ডিং পাস এবং ইতালির শেনজেন ভিসা তুলে দেওয়া হয়। এসব কাগজপত্র দেখে ভুক্তভোগীরা বিশ্বাস করেন যে তারা বৈধভাবে ইতালিতে প্রবেশ করতে পারবেন এবং সেখানে চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন।
তদন্তে জানা যায়, গত ২৬ মে ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দীর্ঘ যাত্রা শেষে তারা ইতালির রোম ফিউমিচিনো লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের পাসপোর্টে সংযুক্ত শেনজেন ভিসা পরীক্ষা করে। যাচাই-বাছাইয়ের একপর্যায়ে ভিসাগুলো জাল বলে শনাক্ত হয়।
পরবর্তীতে ইতালীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে প্রায় দুই দিন হেফাজতে রাখে। প্রয়োজনীয় তদন্ত শেষে ২৮ মে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফিরে আসার পর ইমিগ্রেশন পুলিশ, সিআইডি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তখন ভুক্তভোগীরা পুরো ঘটনার বর্ণনা দেন এবং মানবপাচারকারী চক্রের প্রতারণার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেন।
সিআইডির তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশে বৈধ কর্মসংস্থানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাল ভিসা তৈরি ও সরবরাহ করত। এরপর বিদেশে পাঠানোর নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করে ভুক্তভোগীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলত। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সর্বস্ব বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে এই অর্থের ব্যবস্থা করেছেন বলেও জানা গেছে।
ঘটনার পর বিমানবন্দর (ডিএমপি) থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬ এর ৬, ৭, ১৬ ও ১৭ ধারাসহ পেনাল কোডের ৪০৬, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ১০৯ ধারায় মামলা নং-২৭, তারিখ ৩০ মে ২০২৬ রুজু করা হয়।
মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডির টিএইচবি ইউনিট। তদন্ত চলাকালে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে সিআইডি বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আখলাছুর রহমানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়। এরপর অভিযান চালিয়ে আজ ভোর সাড়ে ৩টার দিকে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ থানাধীন নিলক্ষীয়া বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সিআইডি জানিয়েছে, এটি একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান চক্রের অংশ হতে পারে। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রটির মূলহোতা, অর্থ লেনদেনের মাধ্যম, জাল ভিসা প্রস্তুতকারী এবং বিদেশে অবস্থানরত সহযোগীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মানবপাচার চক্রগুলো এখন আগের চেয়ে আরও কৌশলী হয়ে উঠেছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্রের সঙ্গে জাল কাগজপত্র মিশিয়ে এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে যাচাই করা প্রায় অসম্ভব।
বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম সিআইডির টিএইচবি ইউনিট পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে দেশব্যাপী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত সহযোগীদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এদিকে সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন বা ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, বিদেশে যাওয়ার আগে অবশ্যই সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি, বৈধ ভিসা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য যাচাই করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক সুবিধা কিংবা দ্রুত ভিসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে তা সন্দেহের চোখে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিআইডি আরও জানিয়েছে, মানবপাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান বা এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সিআইডিকে অবহিত করার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।



