জাতীয়

ফজলে করিমকে বাঁচাতে ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চার্জশিটভুক্ত আসামি ও রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে হাসপাতালের মাধ্যমে বিশেষ সুবিধা প্রদান এবং বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত করার অভিযোগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ও চট্টগ্রামে সংঘটিত জুলাই-২০২৪ হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলার অন্যতম অভিযোগকারী মুহাম্মদ সম্রাট রুবায়েত।

আবেদনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক প্রফেসর ডা. ধীমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চার্জশিটভুক্ত আসামি ফজলে করিম চৌধুরী বর্তমানে কারাগারে আটক থাকলেও চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। এই অবস্থানের পেছনে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আবেদনকারীর দাবি, চিকিৎসাধীন আসামিকে গত প্রায় আড়াই মাস ধরে হাসপাতালের বিশেষ সুবিধার আওতায় রাখা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, প্রকৃত শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে তাকে ‘ভ্রমণের অনুপযোগী’ হিসেবে দেখিয়ে মেডিকেল রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে সংশ্লিষ্ট আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নির্ধারিত সময়ে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আদালতে হাজিরা বিলম্বিত হওয়ায় বিচারিক কার্যক্রম বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে এবং এতে বিচারপ্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, বিষয়টি শুধু চিকিৎসাগত নয়, বরং এটি বিচারিক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার একটি সম্ভাব্য প্রচেষ্টা কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এছাড়া আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্ত চিকিৎসক এবং ফজলে করিম চৌধুরীর নিজ এলাকা একই হওয়ায় তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত বা সরকারি প্রতিবেদনের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি।

ফজলে করিম চৌধুরীকে ঘিরে রাউজানের রাজনৈতিক ইতিহাসও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আবেদনকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত প্রায় ১৭ বছর রাউজানের সাধারণ মানুষ নানা ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা, ভয়ভীতি ও ক্ষমতার প্রভাবের মধ্যে জীবনযাপন করেছেন। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বহু ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পাননি এবং অনেক অভিযোগ কখনোই আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোয়নি।

জুলাই-২০২৪ পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অতীতের বিভিন্ন অভিযোগের বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার দাবি জোরালো হলেও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। সেই প্রেক্ষাপটে ফজলে করিম চৌধুরীর চিকিৎসা ও আদালতে উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য সচিব বরাবর দেওয়া আবেদনে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ফজলে করিম চৌধুরীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা নির্ণয়ের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মেডিকেল বোর্ড গঠনেরও অনুরোধ করা হয়েছে।
আবেদনকারী মনে করেন, বিষয়টি শুধু একজন আসামির চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশ্ন নয়; বরং এটি বিচারিক স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা জরুরি।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ধীমান চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

এদিকে আবেদনটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button