অনুসন্ধানঅপরাধচট্টগ্রাম

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসের ডিডি বিপুল কুমারের যোগসাজশে গ্রাহক হয়রানি চরমে, অনুসন্ধানে উঠে এলো নানান অভিযোগ

এম শাহীন আলম: চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে নতুন উপ-পরিচালক (ডিডি)বিপুল কুমার গোস্বামী যোগদানের পর থেকে সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি বেড়েছে চরমে এবং ডিডি বিপুল কুমার গোস্বামীর অদৃশ্য যোগসাজশে দালালচক্র আরও সক্রিয় হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে। সরেজমিন অনুসন্ধানে গ্রাহকদের ভোগান্তি, দালালদের সক্রিয়তা এবং সেবা প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সকাল ১০টার দিকে উপ-পরিচালক (ডিডি) বিপুল কুমার গোস্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হলে তিনি শুরুতেই বলেন, জেলা পর্যায়ের একটি বড় অফিস পরিচালনা করা তার জন্য  অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এবং তিনি অফিস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সকাল থেকেই তিনি প্রায় ৪০ জন সাংবাদিককে বিদায় করেছেন। তখন ঘড়ির কাঁটায় সময় ছিল প্রায় পৌনে ১১টা।
আলাপচারিতায় তিনি সাংবাদিকদের সম্পর্কে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এছাড়াও তিনি জানান, তিনি মাত্র এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় আগে এই অফিসে যোগ দিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি এক মাসেরও বেশি সময় আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। কথোপকথনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার দেওয়া একাধিক তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে মিলেনি। দিনের শুরুতে তিনি তার অফিসের কার্যক্রম শুরু করেছেন মিথ্যা বুলি দিয়ে।

সরেজমিনে বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপ-পরিচালক বিপুল কুমার গোস্বামী যোগদানের পর থেকে পাসপোর্ট সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে বেশি হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিসে দালালচক্রের প্রভাব এতটাই বেড়েছে যে সরকারি নিয়মে আবেদন করতে গেলে নানা অজুহাতে আবেদন ফেরত দেওয়া হয়। অথচ দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে আবেদন করলে একই আবেদন সহজেই গ্রহণ করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরাসরি আবেদন জমা দিতে গেলে বিভিন্ন ধরনের ভুল দেখিয়ে আবেদনকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দালালদের মাধ্যমে আবেদন করলে একই ধরনের সমস্যা আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে কয়েকজন গ্রাহকের সাথে কথা বললে তারা জানান, সরাসরি আবেদন নিয়ে একেকজন তিন বার, চার বার এসে ঘুরছে, গ্রাহকদের অভিযোগ দুতলায় পাসপোর্ট অফিসের আবেদন চেক করা মুরুব্বি লোকটি আবেদন নিয়ে আসলে একেকদিন একেকটা দোষ ধরে তাদের ঘুরাচ্ছেন এবং হয়রানি করছেন। আর দালালদের মাধ্যমে যারা আসছেন তাদেরকে মুরুব্বি লোকটি কোন প্রশ্ন না করেই আবেদন ফরমটি জমা নিয়ে তাদের ছবি তুলতে পাঠাচ্ছেন। আর যারা কোন দালালদের সহযোগিতা নিচ্ছেন না সেই গ্রাহকদের নিয়মিত হয়রানি করছেন এবং গ্রাহকদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আক্রমণাত্মক আচরণও করছেন মুরুব্বি লোকটি। গ্রাহকরা আরও জানান, এই মুরুব্বি লোকটি আবেদন চেকের নামে একটার পর একটা আবেদনে ভুল ধরে যখন হয়রানি করেন তখন পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে এসে গ্রাহকরা দখন বাধ্য হয়ে দালালদের শরণাপন্ন হন। স্থানীয় লোকজন ও সেবা গ্রহিতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসে সরাসরি আবেদন জমা দিতে গেলে সহজ কাজটাও তার বিভিন্ন শর্তের বেড়াজালে কঠিন করে দেন,আর দালাল সিন্ডিকেটের চেনের মাধ্যমে গেলে শত ভুল আর যতো সমস্যা থাকুক না কেন কঠিন জটিল সমস্যা থাকলেও আবেদন নিয়ে কোন ভুল আর হয়রানির শিকার হতে হয় না। আর এই ভুল আর হয়রানি থেকে বাঁচতে রেগুলার পাসপোর্টে গ্রাহকদের সরকারি ফি ছাড়াও গুনতে হয় প্রতিটি পাসপোর্টে আরো ৩ থেকে সাড়ে হাজার টাকা। দালালদের সাথে একেকটা পাসপোর্ট গ্রাহকদের কন্ট্রাক্ট করতে হয় সাড়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

দালালদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের মধ্যে প্রতি আবেদনে এক হাজার থেকে বারোশ টাকা করে প্রতিদিন বিকেলে “অফিস খরচ” হিসেবে ডিডি স্যারের পিএ এর কাছে ফাইল গুনে জমা দিতে দিতে হয় বলে তারা দাবি করেন।
দুজন দালাল আরও দাবি করেন, বর্তমান উপ-পরিচালক যোগদানের পর পাসপোর্টে যত জটিলতাই থাকুক না কেন, তারা শতভাগ সমাধান করতে পারেন। আরেকজন দালাল বলেন, বর্তমানে তাদের মাধ্যমে কাজ করাতে কোনো সমস্যা হয় না। অফিসের ভেতরের কর্মকর্তারা তাদের ফাইল সহজেই চিনতে পারেন এবং নিয়মিত হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি পাসপোর্টের বিপরীতে এক হাজার টাকা করে জমা দেওয়া হয় বলেও দালাল দাবি করেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধান করে আরো জানা যায়, পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসেটিতে একটি দালাল সিন্ডিকেটের চেনের মাধ্যমে সরকারি খোলার দিনে যতো গুলো পাসপোর্টের আবেদন জমা হয় তার মধ্যে ৬০% আবেদন দালালদের মাধ্যমে জমা হয় আর এই ৬০% আবেদন থেকে গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্যের ঘটনা ঘটে।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে কিছু ব্যক্তি নিজেদের বিভিন্নভাবে পরিচয় দিয়ে দ্রুত পাসপোর্ট করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেন, অফিসে সরাসরি গেলে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে তুলনামূলক দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে অনেকেই দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, অনলাইন আবেদন, তথ্য সংশোধন, ছবি তোলা কিংবা পুলিশ ভেরিফিকেশন সংক্রান্ত বিষয়ে তারা অযথা জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। পরে দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তারা অফিসের ভেতর ও বাইরে প্রভাব বিস্তার করে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে। এতে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবার মান উন্নয়ন, দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তাদের মতে, এতে জনগণের আস্থা ফিরবে এবং সরকারি সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। অপরাধ বিচিত্রার “ঈগল টিম” এর অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে এই পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসটিতে গ্রাহক হয়রানি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে নিউজ চলমান থাকবে। 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button