
শাহীন আলম :
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌর ভূমি অফিসে সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, দালালনির্ভর সেবা, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের নানা দিক উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান নায়েব সাদ্দাম হোসেন যোগদানের পর থেকে অফিসটিতে স্থানীয় একটি দালাল চক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষকে দালালদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলছেন নায়েব সাদ্দাম হোসেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি নথি অনুযায়ী তারাব পৌর ভূমি অফিসে চারজন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। তবে অফিসের বিভিন্ন কক্ষে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি একাধিক বহিরাগত ব্যক্তিকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, নায়েব সাদ্দাম হোসেনের কক্ষে একজন কম্পিউটার অপারেটরের পাশাপাশি একজন বহিরাগত ব্যক্তি নিয়মিত অবস্থান করেন। পাশের সহকারী নায়েবের কক্ষেও একজন বহিরাগতকে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করতে দেখা যায়। অফিসে প্রবেশমুখে দুটি টেবিলে আরও কয়েকজন বহিরাগতকে বসে কাজ করতে দেখা যায়। এমনকি ভবনের সিঁড়ি পর্যন্ত তাদের অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যেখানে একটি ভূমি অফিসের রেকর্ড রুম সাধারণ মানুষের প্রবেশের জন্য সংরক্ষিত ও সীমাবদ্ধ থাকার কথা, সেখানে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়াও আরও কয়েকজনকে রেকর্ড রুম থেকে ফাইলপত্র নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। এসব দৃশ্য সরকারি নথির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
** গ্রাহকদের অভিযোগ
সরেজমিনে সেবা নিতে আসা একাধিক গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারাব পৌর ভূমি অফিসে দালাল ছাড়া সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অভিযোগ অনুযায়ী, খাজনা পরিশোধ, নামজারি (খারিজ), জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন আবেদনসহ প্রায় সব ধরনের কাজে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়।
গ্রাহকদের ভাষ্য, দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সরাসরি অফিসে গিয়ে আবেদন করলে নানা অজুহাতে দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস ঘুরতে হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ফাইল আটকে রেখে দালালদের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বাধ্য করেন ভুমি অফিসটিতে কর্তব্যরত নায়েব।
** স্থানীয়দের অভিযোগ
জমির খারিজের আবেদন করার পর দালালদের সঙ্গে সমঝোতা না করলে নায়েব সহজে সার্ভে তদন্ত ও প্রতিবেদন দিতে চান না। বিভিন্ন অজুহাতে আবেদনকারীদের হয়রানি করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, দালালদের মাধ্যমে একটি সাধারণ খারিজ করতে সর্বনিম্ন ৮ হাজার টাকা থেকে শুরু করে জমির জটিলতা অনুযায়ী আরও অনেক বেশি অর্থ আদায় করা হয়। এমনকি কাগজপত্রে সমস্যা থাকলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তা সমাধানের অভিযোগও করেছেন একাধিক গ্রাহক ও স্থানীয় বাসিন্দা।
স্থানীয়দের দাবি, নায়েব সাদ্দাম হোসেন যোগদানের পর থেকে দালালদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়েছে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা না করলে সহজে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। আর অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করলে দ্রুত সেবা মিলছে—এমন অভিযোগও করেছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী।
** নায়েবের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ
অভিযোগের বিষয়ে নায়েব সাদ্দাম হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অফিসের অনিয়মের বিষয়ে বার্তা পাঠানো হলে তিনি অভিযোগের প্রমাণ দেখতে চান।
** এসিল্যান্ডকে অবহিত
সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় অফিসে অবস্থানরত কয়েকজন কথিত দালালের ছবি এবং অনিয়মের বিষয়গুলো রূপগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ মারজানুর রহমানকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে অবহিত করা হয়।
জবাবে তিনি বলেন, আপনি আমাকে জানিয়েছেন, তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমি খুব শিগগিরই তারাব পৌর ভূমি অফিসের দালাল চক্র এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তিনি হোয়াটসঅ্যাপে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়ে তারাব পৌর ভুমি অফিস থেকে দালালদের বের করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অবগত করলেও বাস্তবে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দালালদের দৌরাত্ম আগের মতোই দেখা গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
** অনুসন্ধানের জেরে হুমকির অভিযোগ
অনুসন্ধান চলাকালে দালালদের কয়েকটি ছবি নায়েব ও এসিল্যান্ডকে পাঠানোর পর শাহাদাত নামের এক ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ কলে ওই ব্যক্তি প্রথমে জানতে চান কেন তারাব পৌর ভূমি অফিসে যাওয়া হয়েছে, কেন দালালদের ছবি নায়েব ও এসিল্যান্ডকে পাঠানো হয়েছে এবং মোবাইল ফোন বন্ধ কেন ছিল। একপর্যায়ে তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং ভবিষ্যতে তারাব ভূমি অফিসের আশপাশে দেখা গেলে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন।
** অনুসন্ধান অব্যাহত
তারাব পৌর ভূমি অফিসে দালাল চক্র, গ্রাহক হয়রানি, অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে আরও নতুন তথ্য, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী পর্ব প্রকাশ করা হবে।



