কুমিল্লা সদর উপজেলা ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরার বিরুদ্ধে প্রশাসনে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত অভিযোগ

এম শাহীন আলম :
কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলায় কর্মরত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছরের কর্মকালেই বিভিন্ন প্রকল্প, সরকারি বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন, ভূমি হস্তান্তর কর, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরও বড় ধরনের দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে।
** উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাতেমা তুজ জোহরার বিরুদ্ধে অনিয়মের ফিরিস্তি নিন্মে তুলে ধরা হলো –
১. প্রশিক্ষণের নামে প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ :
অভিযোগ রয়েছে, গত ২০২৫ সালের ৪ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ইউনিয়ন পরিষদের জন্য মাত্র একটি তিনদিনের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হলেও কাগজে-কলমে ছয়টি ইউনিয়নে পৃথক ছয়টি প্রশিক্ষণ দেখানো হয়।
বাস্তবে প্রশিক্ষণ না দিয়েই প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
২. উপজেলা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের এসি নিজ বাসায় নেওয়ার অভিযোগ :
গত বছর উপজেলা চেয়ারম্যানের কক্ষে প্রায় ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত দুটি নতুন দুই টন এসি খুলে ইউএনওর সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
৩. উপজেলা পরিষদের পুকুরের মাছ বিক্রির অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ :
উপজেলা পরিষদের পুকুর থেকে মাছ বিক্রির অর্থ সরকারি রাজস্ব তহবিলে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও দায়িত্ব পালনকালে একাধিকবার মাছ বিক্রি করলেও সেই অর্থ সরকারি হিসাবে জমা হয়নি। এতে প্রায় ৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
৪. টেন্ডার ছাড়াই ৬০ লাখ টাকার কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ :
অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের প্রায় ৬০ লাখ টাকার ২১টি উন্নয়ন কাজ উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া পিআইসি (PIC)-এর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়বিধির পরিপন্থী।
৫. একই বৃক্ষরোপণ প্রকল্প দুইবার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ :
প্রথমে উপজেলা পরিষদ থেকে ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে বৃক্ষরোপণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর আবার একই প্রকল্প ইউনিয়ন পরিষদের নামে দেখিয়ে আরও ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তে দেখা যাবে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবে কোনো বৃক্ষরোপণ হয়নি।
৬. খাল পরিষ্কারের নামে ১৮ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ :
ছয়টি ইউনিয়নে খাল খনন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে কচুরিপানা পরিষ্কারের ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
৭. দুর্গাপূজার নামে ১২ লাখ টাকা উত্তোলন
অভিযোগ রয়েছে :
অভিযোগ অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে দুর্গাপূজার ব্যয়ের কথা বলে ২ লাখ টাকা করে মোট ১২ লাখ টাকা ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে।
৮. সিসি ক্যামেরা প্রকল্পে দ্বৈত অর্থ আদায়ের অভিযোগ :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সরকার প্রতিটি উপজেলায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দিলেও অভিযোগ এবং
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আরও ১২ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
সরকারি বরাদ্দের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়। এবং নিম্নমানের সিসি ক্যামেরা ক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
৯. সরকারি বাসভবন সংস্কারে অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ :
অভিযোগ অনুযায়ী যোগদানের পরপরই উপজেলা পরিষদের অর্থে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সরকারি বাসভবন সংস্কার করা হয়।
পরে ছয় ইউনিয়ন থেকে আরও ১২ লাখ টাকা আদায় করা হয়।
গত দেড় বছরে সরকারি বাসভবনে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে।
১০. উপজেলার উন্নয়ণ মূলক কার্যক্রমে প্রতিটি বিল থেকে ২ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন ঠিকাদারের অভিযোগ অনুযায়ী—
উপজেলা প্রশাসক হিসেবে ১ শতাংশ
ইউএনও হিসেবে আরও ১ শতাংশ
মোট ২ শতাংশ কমিশন না দিলে বিলে স্বাক্ষর করা হতো না।
১১. ঘুষে সহযোগিতা না করায় প্রশাসককে অপসারণের অভিযোগ :
দুর্গাপুর (দক্ষিণ) ইউনিয়নের প্রশাসক (মৎস্য কর্মকর্তা) ভুয়া প্রকল্পের অর্থ ইউএনওকে দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
১২. মাস্টারপ্ল্যান উপেক্ষা করে অফিসার্স ক্লাব নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ :
আমড়াতলীতে উপজেলা পরিষদের নতুন কমপ্লেক্সের মাস্টারপ্ল্যানে অফিসার্স ক্লাবের জন্য নির্ধারিত জায়গা থাকা সত্ত্বেও আবাসিক ভবনের জন্য সংরক্ষিত স্থানে অফিসার্স ক্লাব নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আপত্তি উপেক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
১৩. ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ :
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময় ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করা হয়েছে।
১৪. ভূমি হস্তান্তর কর (১%) বরাদ্দে অনিয়ম
কমিশন আদায়ের অভিযোগ :
ইউনিয়ন পরিষদে দেওয়া ভূমি হস্তান্তর করের (১%) বরাদ্দ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
১৫. ভুয়া প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন
সরকারি বিধি অনুযায়ী সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে প্রায় এক কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
১৬. ভবনের নকশা অনুমোদনে অনিয়ম
অভিযোগ অনুযায়ী :
সরকারি ফি ৮-১০ হাজার টাকা হলেও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।
১৭. উপজেলা সহকারী প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
কমিটির অন্যান্য সদস্য ও বহিরাগত প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন নকশা আটকে রাখা হয়েছে।
১৮. সহকর্মীদের গৃহকর্মে বাধ্য করার অভিযোগ :
অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা পরিষদের মালী সেলিনা আক্তারকে সরকারি বাসভবনে গৃহস্থালি কাজে বাধ্য করা হয়।
তিনি রাজি না হওয়ায় চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং পরে একই শর্তে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
১৯. একই অভিযোগ রয়েছে :
অফিস সহায়ক ফৌজিয়া আক্তার
অ্যাকাউন্টস ক্লার্ক রুবিনা পারভীন
তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
২০. পিআইওকে বদলির অভিযোগ
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (PIO) মো. রিয়াদ হোসেন ইউনিয়নভিত্তিক বরাদ্দ থেকে অর্থ আদায়ে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে দ্রুত রাঙামাটিতে বদলি করা হয় বলে অভিযোগ।
২১। চলতি বছরের ২২ এবং ২৩ জুন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম টুটুলের রৌদ্র এন্টারপ্রাইজ নামে ২ টি বিল পাস হয়। যার পরিমান ১৬০১৮৯৮ টাকা ও ১১৫০১২২ টাকা
ফ্যাসিস্টদের দেসর মোর্শেদ এর মাধ্যমে সব কিছু হয়। এই বিলে গরমিল রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
** অভিযোগ রয়েছে গত ২০২৫ সালের ৪ঠা নভেম্বর উপজেলার ৬ টি ইউনিয়ন এ বৃক্ষরোপন কর্মসূচির নামে ২৫,৫০০ করে মোট ১৫ লক্ষ ৩০ হাজার ভুলা বিল দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করে নেয়।
** অভিযোগ রয়েছে গ্রাম পুলিশের প্রশিক্ষণ এর নামে ৮০ হাজার টাকা নিলেও গ্রাম পুলিশদেরকে কোন টাকা তিনি দেননি।
** অভিযোগে রয়েছে তিনি ১% থেকে ২০% কেটে রেখে ২ গাড়ি নামে প্রতি মাসে বিল উত্তোলন কিন্তু তিনি গাড়ি ব্যবহার করেন ১টি।
** গত কোরবানির ঈদের গরুর বাজারে ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরার নামে উপজেলার অফিস খরচ বাবদ প্রতিটি বাজার থেকে ২০/৩০/৫০ পর্যন্ত চাঁদা আদায় অভিযোগ উঠেছে তার অফিসের সোহাগ এবং মোর্শেদ এর বিরুদ্ধে।
২২. সিএ মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযোগে ইউএনওর সিএ মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
** জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে নকশা অনুমোদন।
** অবৈধ অর্থ লেনদেনের মধ্যস্থতা।
** অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া।
** ইউএনওর আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করা।
২৩। সিটি কর্পোরেশন এর টিসিবির তদন্তের রিপোর্টের নামে প্রতি ডিলারের কাছ থেকে ইউএনও ফাতেমা তুজ জোহরার রেফারেন্স ৩০.০০০ টাকা করে আদায় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে সোহাগ এবং মোর্শেদ এর বিরুদ্ধে।
এই বিষয়ে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাতেমা তুজ জোহরার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বক্তব্যে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এর প্রমাণস্বরূপ সব ফাইল, রেজুলেশন ও নথি সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি জানান, অভিযোগে উল্লেখিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী বৈধভাবে নৈমিত্তিক মজুরিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত এবং সরকারি বাংলোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অতিরিক্ত আনসার সদস্য নিয়োগের অভিযোগও সঠিক নয়; এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা উপজেলা বা জেলা আনসার-ভিডিপি কর্তৃপক্ষের। তিনি সাংবাদিককে উপজেলা কার্যালয়ে এসে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, যাচাই-বাছাই করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশের জন্য তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন জানান।
অভিযোগকারীদের দাবি
অভিযোগকারীদের মতে, উপজেলা প্রশাসনের নথিপত্র, প্রকল্পের হিসাব, টেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য, নকশা অনুমোদনের রেজিস্টার, ঠিকাদার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, প্রশাসক ও সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য যাচাই করলে আরও বিস্তৃত অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে।
তবে অভিযোগগুলোর ব্যাপকতা, আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো জনস্বার্থে গভীর অনুসন্ধানের দাবি সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগকারীদের আহ্বান, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।



