অনুসন্ধানঅপরাধঅব্যাবস্থাপনাঅভিযানআইন ও বিচারআইন-শৃঙ্খলাএক্সক্লুসিভতল্লাশিদুর্নীতিপ্রতারনাবিবিধমাদক

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মনির হোসেনের বিরুদ্ধে অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের ওপর চরম অমানবিক আচরণ

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মনির হোসেনের বিরুদ্ধে অধীনস্থ পুলিশ সদস্যদের ওপর চরম অমানবিক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মালখানার সরকারি মালামাল আত্মসাতের মতো একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর নিষ্ঠুরতা ও জেদের কারণে এক কনস্টেবলের নবজাতক যমজ সন্তানের মৃত্যু এবং অসুস্থ আরেক ড্রাইভার কনস্টেবলের মৃত্যুর পর অসংবেদনশীল মন্তব্য করার ঘটনায় খোদ পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ওসি মনিরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:
সরকারি মালখানার কম্বল আত্মসাৎ ও আদালতে ভুয়া প্রতিবেদন
শুধু অমানবিক আচরণই নয়, ওসির বিরুদ্ধে সরাসরি নথিপত্র জালিয়াতি ও চুরির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মেগলাবাজার থানার জিআর মামলা নং ০৫/২৬ এর জব্দকৃত মালামাল হিসেবে উদ্ধার হওয়া ৫৬০ পিস কম্বলের জায়গায় ওসি মনির ক্ষমতার অপব্যবহার করে নথিতে ৪৩০ পিস দেখান। বাকি ১৩০ পিস কম্বল (যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ লক্ষ টাকা) তিনি নিজে আত্মসাৎ করেন। এই জালিয়াতি আড়াল করতে তিনি বিজ্ঞ আদালতে একটি ভুয়া ও মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেছেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও ফৌজদারি অপরাধ।
সহকর্মীর মৃত্যুতে ওসির অমানবিক মন্তব্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওসির এমন নিষ্ঠুর আচরণ থানায় এবারই প্রথম নয়। কিছুদিন আগে এই থানায় কর্মরত ড্রাইভার কনস্টেবল মোঃ মতিন মিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য ছুটি প্রার্থনা করলে ওসি তা নাকচ করে দেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে তিনি ইমার্জেন্সি ছুটিতে যান এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সহকর্মীর মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের বদলে ওসি থানায় অত্যন্ত অবহেলার সুরে বলেন, “একজন ড্রাইভার মারা গেছে তো কী হয়েছে, আরেকজন ড্রাইভার আসবে।”
ছুটি না দেওয়ায় চিকিৎসাবঞ্চিত যমজ নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু
থানা সূত্রে জানা গেছে, মোগলাবাজার থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত এক কনস্টেবলের স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে গর্ভকালীন জটিলতায় ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য এসএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই কনস্টেবলের ৫ দিনের ছুটি মঞ্জুর হলেও ওসি মনির হোসেন তাঁকে ছুটি ছাড়েনি।
যথাসময়ে চিকিৎসা না করতে পারায় গত ১৬ জুন ২০২৬ খ্রিঃ তারিখ সকালে ওই কনস্টেবলের স্ত্রীর তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হলে তিনি ওসির কক্ষে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং ছুটি কার্যকর করার আকুতি জানান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওসি অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করে সবার সামনে চিৎকার করে বলেন, “আগে ভিভিআইপি ডিউটি, তারপর ছুটি।” একপর্যায়ে তিনি অত্যন্ত অসংবেদনশীল মন্তব্য করে বলেন, “হাসপাতালে কি আজরাইল দাঁড়িয়ে আছে যে আপনি গেলে আজরাইল চলে যাবে?” আমি ছুটি দিবো না আপনি আমার বিরুদ্ধে আইজিপি/কমিশনার স্যারে কাছে বলতে পারেন। ওসির উগ্র আচরণ ও হুমকির মুখে পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে ছুটি মিললেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়।
হাসপাতালে নেওয়ার আগেই যমজ সন্তান প্রসব করেন ওই গৃহবধূ। যথাযথ চিকিৎসার অভাবে একে একে দুটি নবজাতকই (এক কন্যা ও এক পুত্র) মারা যায়। ওসির জেদের কারণে হতভাগ্য পিতা তাঁর ১ জন সন্তানকে জীবিত বা মৃত শেষ দেখার সুযোগ পাননি।

অধীনস্থদের মারধর ও চাকরিচ্যুতির হুমকি
থানার একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, থানায় ওসির ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। গত এপ্রিল মাসে কনস্টেবল সাইফুল ইসলামকে থানার অভ্যন্তরে অত্যন্ত অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, মারতে উদ্যত হন এবং চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন। এছাড়া মে ও জুন মাসের মধ্যে থানার ভেতরেই কর্তব্যরত এসআই শিহাব এবং এএসআই জয়নালকে মারধর করার জন্য উগ্রভাবে তেড়ে যান ওসি। ড্রাইভার কনস্টেবল সুশান্তকেও অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও মানসিক নির্যাতন করায় তিনি প্রতিকার চেয়ে পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
কমিশনার কার্যালয়ের নীরবতা নিয়ে ক্ষোভ
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ওসি মনির হোসেনের এহেন উগ্র ও অপেশাদার আচরণের বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে কমিশনার কার্যালয়ে ৩/৪টি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। নবজাতকদের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনার পরও বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণাদিসহ পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত ওসির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এই রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মনে নানা প্রশ্ন, ক্ষোভ ও হতাশার দানা বাঁধছে।
বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা, সরকারি মালখানার নিরাপত্তা এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত এই ওসির বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনপূর্বক জরুরি ভিত্তিতে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button