ধর্ম ও জীবন

আল্লাহর এক বান্দা” অনেক অনেক কাল আগের কথা। এক নির্জন প্রান্তরে একটি ছোট্ট ঘরে থাকতেন এক সাধারণ বান্দা। তাঁর নাম কেউ জানত না, সমাজে তিনি ছিলেন অতি সাধারণ। কিন্তু আল্লাহর কাছে তিনি ছিলেন অসাধারণ।

দিন-রাত তাঁর একমাত্র কাজ ছিল আল্লাহর ইবাদত। বিশেষ করে নামাজ। ফরজ নামাজের পাশাপাশি তিনি অসংখ্য নফল নামাজ পড়তেন। রাতের অন্ধকারে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ত, তখন তিনি উঠে তাহাজ্জুদ পড়তেন। সকালে ফজরের পর থেকে দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা—প্রতি ওয়াক্তের নামাজের পরেও তিনি বসে থাকতেন আল্লাহর সামনে।

তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অবস্থা ছিল সিজদা। সিজদায় গেলে তিনি যেন দুনিয়া ভুলে যেতেন। কপাল মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে বলতেন, “ইয়া আল্লাহ! আমি তোমারই, তোমারই জন্য। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।” চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরত, বুক ভেসে যেত কান্নায়। সিজদা থেকে উঠতে তাঁর ইচ্ছাই করত না। যেন সেই মুহূর্তে তিনি আল্লাহর সবচেয়ে কাছে।

একদিন, গভীর রাতে। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু বাতাসের ফিসফিসানি। বান্দা তখনও সিজদায়। কপাল মাটিতে, হাত দুটো ছড়িয়ে, পা দুটো সোজা। তাঁর সমস্ত সত্তা আল্লাহর দিকে নিবেদিত। হঠাৎ আল্লাহ তা’আলা তাঁকে সরাসরি ডেকে বললেন:

“বান্দা!”

বান্দা চমকে উঠলেন না। বরং তাঁর হৃদয় আনন্দে ভরে উঠল। তিনি ভাবলেন, “আমার রব আমাকে ডাকছেন! কী সৌভাগ্য!”

আল্লাহ বললেন:

“তুই যত ইচ্ছে নামাজ পড়, তুই যতই সিজদা কর… তোর ঠিকানা জাহান্নাম!”

কথাটি শুনে বান্দা এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে, গভীর আনন্দের সাথে বলতে লাগলেন:

“আলহামদুলিল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ…”

তাঁর চোখ থেকে আরও বেশি করে পানি ঝরতে লাগল। কিন্তু এটা ছিল খুশির পানি। তিনি সিজদায় আরও গভীরভাবে মাথা ঠেকিয়ে বলতে থাকলেন, “হে আমার রব! তুমি আমাকে ডেকেছ, তুমি আমার সাথে কথা বলেছ—এটাই তো আমার জন্য যথেষ্ট। জাহান্নামে যেতে হয় তো যাব। কিন্তু তোমার এই ডাক, তোমার এই কথা—এটা তো আমার বুকে চিরকাল থাকবে।”

আল্লাহ তা’আলা তখন আবার বললেন:

“এই বান্দা জাহান্নামের কথা শুনে কাঁদছে না, বরং আলহামদুলিল্লাহ বলছে! সে আমার প্রতি এতটাই নির্ভরশীল যে, আমার ইচ্ছার সামনে তার কোনো আপত্তি নেই। সে শুধু আমার সন্তুষ্টি চায়।”

তারপর আল্লাহ বললেন:

“হে বান্দা! তোমার জন্য জাহান্নাম নয়। তোমার ঠিকানা জান্নাতুল ফিরদাউস। কারণ তুমি আমাকে এমনভাবে ভালোবেসেছ যে, আমার যেকোনো সিদ্ধান্তই তোমার কাছে কবুল। তোমার নামাজ, তোমার সিজদা, তোমার কান্না—সবকিছু কবুল করা হলো।”

বান্দা তখনও সিজদায়। তাঁর শরীর কাঁপছিল আনন্দে। তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে থাকলেন।

শিক্ষা
এই কাহিনীর মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ। নামাজ ও সিজদা শুধু শারীরিক কাজ নয়, এটা হৃদয়ের। যে বান্দা আল্লাহকে এতটাই ভালোবাসে যে, জাহান্নামের কথা শুনেও “আলহামদুলিল্লাহ” বলে, আল্লাহ তাঁকে কখনো অপমানিত করেন না। বরং তাঁর ভালোবাসা দেখে আল্লাহ নিজেই খুশি হন।

আমরা যেন এই বান্দার মতো নামাজ পড়ি—শুধু রিয়া বা অভ্যাসের জন্য নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। সিজদায় গিয়ে যেন আমরাও বলতে পারি: “ইয়া আল্লাহ! তুমি যা চাও, তাই আমার জন্য ভালো।”

আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন ইখলাস ও আত্মসমর্পণ দান করুন। আমীন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button