হত্যা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত মুশা,দীর্ঘদিনেও গ্রেপ্তার না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মাহবুব আলম মানিক : সাভারের হেমায়েতপুরে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা ও অস্ত্রের অভিযোগে আলোচিত ‘মুশা বাহিনী’র দাপট যেন থামছেই না। এবার এই বাহিনীর প্রধান মুশা একটি হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত হয়ে পলাতক। ৩১ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় অপু রাড়ী নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে-হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন?
শুধু হত্যা মামলা নয়,হেমায়েতপুরে মুশা বাহিনীকে ঘিরে হামলা, গুলি, মারধর, দখল ও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফুটপাত থেকে শুরু করে মহাসড়কের অংশবিশেষ, পার্কিং, জয়নাবাড়ির সরকারি রাস্তা, হকার বসানো, ডিশ-ইন্টারনেট ও ঝুট ব্যবসা-বিভিন্ন খাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে এই চক্র।
নিহত অপু রাড়ীর ভাই সোহান রাড়ীর দায়ের করা এজাহার অনুযায়ী, গত ১৪ জুলাই ভোরে দারুস সালাম থানাধীন গাবতলী এলাকায় অপু রাড়ী ও ইফতিয়ার রায়হানকে ঘিরে ফেলা হয়। একপর্যায়ে অপুকে ‘ছিনতাইকারী’ অপবাদ দিয়ে লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয় বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় অপুকে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে লালমাটিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় মুশাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল হোসেন বলেন, “তাকে গ্রেপ্তার করতে চেষ্টা করছি।”
কিন্তু নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় প্রধান অভিযুক্তের অভিযোগ থাকার পরও কেন এতদিনেও তাকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না?
পরিবারের অভিযোগ, সময় যত গড়াচ্ছে, অভিযুক্তের পালিয়ে থাকার সুযোগ তত বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাভারের হেমায়েতপুরে আলোচিত মুশার বাহিনীর প্রধান নাম মোশারফ হোসেন ওরফে ‘মুশা’। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। এমনকি চাঁদা না দিলে পিস্তল দিয়ে গুলি করেন তিনি।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে চাঁদার দাবিকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী রমজান আলীকে গুলি করার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় মামলা হলে মোশারফ গ্রেপ্তার হন। তবে তার কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই মামলায় জামিনে বের হওয়ার পরও তার প্রভাব কমেনি বরং দম্ভ করে বলেন গুলি করলে রমজানকে করেছি তোমরা কি পীর সাব? এলাকায় নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে অনুসারীদের নিয়ে সক্রিয় রয়েছেন।
মোশারফ আরও দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তার বাহনীর কাছে একাধিক অস্ত্র রয়েছে। তার বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক ব্যক্তিকে মারধর, গুরুতর জখম এবং পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সরাসরি হামলা করা হয়েছে তার গড়া তোলা বাহনী দিয়ে।
স্থানীয়ভাবে মোশারফ হোসেন তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছে।
মোশারফের সহযোগী সাদ্দামের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের একটি অংশ ও সংলগ্ন ফুটপাত।
জয়নাবাড়ি এলাকায় সরকারি রাস্তা দখল করে হকার বসিয়ে টাকা আদায়, মহাসড়কে পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জুয়ার আসর ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
হেমায়েতপুরের সিংগাইর সড়কের একাংশে থাকা শত শত ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকেও নিয়মিত টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, দোকানপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
এ ছাড়া হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে জয়নাবাড়ি সড়ক ও হেমায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জমিতে নির্মিত মার্কেটের দোকানগুলো থেকেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ডিশ-ইন্টারনেট ব্যবসা, গার্মেন্টসের ঝুট এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে মোশারফ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।
সেন্টমার্টিন পরিবহণের কাউন্টার মাস্টার আরিফের অভিযোগ, একটি অসহায় পরিবারের মালপত্র লুটের সময় বাধা দেওয়ায় তাকে হকিস্টিক দিয়ে মারধর করা হয়। এতে তার বাঁ হাতের তিন জায়গা ভেঙে যায় বলে দাবি করেন তিনি।এ ছাড়া আরিফ, মেহেদী, আশরাফুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনকে মারধর ও গুরুতর জখম করার অভিযোগ রয়েছে মুশা-মোশারফ ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল, সরকার পতনের পর সেসব জায়গায় নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।
ফুটপাত, দোকান, পরিবহন, ডিশ-ইন্টারনেট, ঝুট ব্যবসা ও পার্কিং-কোনো ক্ষেত্রই বাদ যাচ্ছে না। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও দখল-চাঁদাবাজির পুরোনো কাঠামো রয়ে গেছে।
হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত দীর্ঘদিনেও গ্রেপ্তার না হওয়া, অস্ত্র ও গুলির ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রকাশ্য তৎপরতা এবং দখল-চাঁদাবাজির একের পর এক অভিযোগ-সব মিলিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
ঢাকার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক দল নেই; তারা ব্যক্তিস্বার্থে দলের নাম ব্যবহার করে। অভিযোগ খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-অপু রাড়ীর মৃত্যুর এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত মুশা কেন গ্রেপ্তার হচ্ছেন না?
পুলিশ বলছে, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কিন্তু নিহতের পরিবারের ক্ষোভ-“হত্যা মামলার আসামি প্রকাশ্যে থাকুক কিংবা আত্মগোপনে থাকুক, তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পুলিশের। সময় গড়াবে, আসামি পালিয়ে বেড়াবে আর পরিবার শুধু বিচারের অপেক্ষায় থাকবে-এটা কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?”
এলাকাবাসীর দাবি, মুশাকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে অপু রাড়ী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হোক। একই সঙ্গে অস্ত্র, গুলি, হামলা, দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগগুলোও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে যে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।



