অনুসন্ধান

আ জ ম নাছিরের ছায়ায় আহমেদ উল্লাহ? মামলা, দখল-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তর অভিযোগ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাটকেন্দ্রিক ব্যবসা, দখল-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচনায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ উল্লাহ। সাবেক চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে কোতোয়ালি ও সদরঘাট থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা থাকার দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট মোড় থেকে স্টেশন রোড এলাকায় কোটা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, গুরুতর জখম ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়ের করা মামলাতেও তার নাম রয়েছে। মামলার নথিতে আহমেদ উল্লাহর পিতার নাম দলিলুর রহমান এবং ঠিকানা ২৭৯ স্ট্যান্ড রোড, সদরঘাট, চট্টগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগে তাকে পশ্চিম মাদারবাড়ি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দুপুর ২টা ১৫ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নিউ মার্কেট মোড়, নতুন স্টেশন ও পুরাতন স্টেশন রোড সংলগ্ন এলাকায় কোটা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বাদীপক্ষের দাবি, ওইদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ আন্দোলনকারী নিউ মার্কেট মোড় থেকে মিছিল নিয়ে স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থান নেন। এ সময় মামলায় নাম থাকা আসামিদের কথিত নির্দেশ, উসকানি কিংবা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ কয়েকশ ব্যক্তি সেখানে জড়ো হন। অভিযোগে হামলাকারীদের হাতে ধারালো অস্ত্র, কিরির, হকিস্টিক, লাঠি ও লোহার রড থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে ককটেল বা বোমা বিস্ফোরণ এবং পরে এলোপাতাড়ি হামলার অভিযোগও করা হয়েছে। বাদীপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় বাদী, মামলার সাক্ষী এবং উপস্থিত বহু ছাত্র-জনতা আহত হন। কারও মাথা, হাত, পা, হাঁটু ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে আহতদের কয়েকজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ১০৯, ৩০৭, ৫০৬(২) ও ৩৪ ধারার উল্লেখ রয়েছে। মামলার বাদীপক্ষের বক্তব্যে আহমেদ উল্লাহকে আ জ ম নাছির উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আর্থিক সহযোগিতাকারী হিসেবে দাবি করা হয়েছে। নগর আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচি, মিছিল-মিটিংসহ রাজনৈতিক কার্যক্রমে তিনি আর্থিক সহায়তা করতেন-এমন অভিযোগও করা হয়েছে।

আহমেদ উল্লাহর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার আলোচনায় উঠে এসেছে বীকন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ লিমিটেড-এর নাম। বাদীপক্ষের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আ জ ম নাছির উদ্দিন ও আহমেদ উল্লাহর যৌথ মালিকানা বা ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া অভিযোগ করা হয়েছে, বাংলাদেশ পাট করপোরেশন/জুট করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন বিজিসি ট্রাস্ট জুট রেলি ঘাটসংলগ্ন খালি জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নামে কীভাবে নবায়ন বা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হলো-তা তদন্তের দাবি রাখে। বাদীপক্ষের একাধিক প্রশ্ন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকার পরও সরকারি বা সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন সম্পত্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে?বাদীপক্ষের আরও দাবি, ২৩ শে জুলাই আ জ ম নাছিরের প্রভাবে বাংলাদেশ পাট জুট কর্পোরেশনের মালিকানাধীন জায়গা অসাধু কর্মকর্তাকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিয়ে ২৩শে জুলাই ফ্যাসিস্ট পলাতক চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ উল্লাহ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বীকন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ লিমিটেড নামে পুনরায় নবায়ন নিলে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানতে পেরে ২৯ শে জুলাই তাদের সেই নবায়ন বাতিল করে দেয়।

তবে এ অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত সিদ্ধান্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাই এই প্রতিবেদনে করা সম্ভব হয়নি। তাই বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।অভিযোগ রয়েছে, নবায়ন বাতিল হওয়ার পরও তাদের গুদাম ও অফিস এখনো দখলে রয়েছে। এসব সরকারি দখলকৃত জমি, খালি জায়গা ও ঘাট অফিস উচ্ছেদ করার জন্য প্রশাসন ও পাট জুট করপোরেশনের পক্ষ থেকে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে বাদীপক্ষ।

আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে সদরঘাট এলাকার বিভিন্ন ঘাট, গুদামঘর ও ব্যবসায়িক স্থাপনা নিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। বাদীপক্ষের আরও দাবি, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সদরঘাটের বিভিন্ন স্থানে তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন।ঘাট, স্টেশন এলাকার গুদামঘর এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জায়গা নিয়ে একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে বিরোধ ও অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন বলে বাদীপক্ষের বক্তব্যে উল্লেখ থাকলেও, এসব ব্যবসায়ীর স্বতন্ত্র বক্তব্য, সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনের জন্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বাদীপক্ষের আরও দাবি, বিভিন্ন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীকে ব্যবহার করে সদরঘাটের ঘাট এলাকায় দখল-বাণিজ্য, জুয়ার আসর, মাদক বিক্রি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সঙ্গে ওই চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে। মামলার বাদীপক্ষের বক্তব্যে আহমেদ উল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে জুনায়েদ নামের এক ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা শীর্ষ সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের ঘনিষ্ঠ কর্মী হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদনে সম্ভব হয়নি।বাদীপক্ষের অভিযোগ, আহমেদ উল্লাহর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও মামলায় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোতোয়ালি ও সদরঘাট থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে-এমন দাবিও করা হয়েছে।

তবে কোনো কর্মকর্তা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেননি-এমন দাবির পক্ষে স্বাধীন তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সরাসরি বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।বাদীপক্ষের দাবি, আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এরপরও তিনি কীভাবে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন এবং তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোতে আইনগত পদক্ষেপের অগ্রগতি কী-তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাদীপক্ষ।
৪ আগস্টের নিউ মার্কেট-স্টেশন রোডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির পাশাপাশি ৩০০ থেকে ৪০০ এবং কোথাও ৪০০ থেকে ৫০০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।বাদীপক্ষের দাবি, হামলা, মারধর, ককটেল বিস্ফোরণ ও হত্যাচেষ্টার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, আহতদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছে তারা।আইনগতভাবে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে-মামলায় আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তি কী, তদন্তে তার ভূমিকার কী প্রমাণ পাওয়া যায় এবং আদালতে অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা প্রমাণিত হয়।

বাদীপক্ষের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পাট জুট করপোরেশনের মালিকানাধীন সরকারি জমি, খালি জায়গা, ঘাট ও অফিস নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। নবায়ন বাতিল হওয়ার পরও যদি কোনো গুদাম, অফিস বা স্থাপনা সরকারি সম্পত্তিতে দখলে থেকে থাকে, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসন ও পাট জুট করপোরেশনের প্রতি জরুরি পদক্ষেপের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে হওয়া চলমান মামলাগুলোতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং মামলার তদন্তে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের আইনগত ভিত্তি থাকলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বাদীপক্ষের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত, আদালতের আদেশ এবং প্রচলিত আইন ও প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তার বক্তব্য পাওয়া গেলে মামলার অভিযোগ, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, বীকন ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ লিমিটেড, বাংলাদেশ পাট জুট করপোরেশনের জমি ও স্থাপনা, সদরঘাটের ঘাট ও স্থাপনা নিয়ে অভিযোগ, নবায়ন ও বাতিলের বিষয় এবং অন্যান্য সব বিষয়ে তার অবস্থান ও ব্যাখ্যা একই গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। আহমেদ উল্লাহর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সংঘর্ষের মামলায় আসামি হওয়া, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আর্থিক সহযোগিতার অভিযোগ, আ জ ম নাছির উদ্দিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের দাবি, সদরঘাটে প্রভাব ও দখল-বাণিজ্যের অভিযোগ, বাংলাদেশ পাট জুট করপোরেশনের মালিকানাধীন জমি ও স্থাপনা ব্যবহারের অভিযোগ এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ।তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই বর্তমানে অভিযোগ, দাবি বা বাদীপক্ষের বক্তব্যের পর্যায়ে রয়েছে। কোনো মামলায় আসামি হওয়া নিজেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের বৈধতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে তদন্ত, প্রামাণ্য নথি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button