কুমিল্লার লাকসামে সাংবাদিকদের সংগঠনে স্থানীয় এমপি’র রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে পেশাদারিত্ব

এম শাহীন আলম: সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন প্রেসক্লাবের কমিটি গঠনে একজন সংসদ সদস্যের সরাসরি নির্দেশনা ও অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কুমিল্লার লাকসামে। একটি লিখিত নথিতে কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালামের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নথিতে এমপির স্বাক্ষরও রয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত ওই তালিকা অনুযায়ী, মুজিবুর রহমান দুলালকে সভাপতি, মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক, তমিজ উদ্দিন আহম্মদ চুন্নুকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সেলিম চৌধুরী হীরাকে সাংগঠনিক সম্পাদক এবং এম.এ জলিলকে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক করা হয়েছে।
লাকসাম প্রেসক্লাবের প্যাডে তৈরি নথিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে লাকসামের গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে একাধিক প্রেসক্লাব ও সংগঠন থাকায় পেশাদার সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যের অভাব রয়েছে এবং এ কারণে বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীদের মান-মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার কথা উল্লেখ করে এমপি আবুল কালামের নির্দেশনার ভিত্তিতে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি নথিতে তুলে ধরা হয়।
এদিকে, ২৮ সেপ্টেম্বরই স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের খবর প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এমপি আবুল কালাম নবগঠিত কমিটিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেশাদার সাংবাদিকদের নিয়ে গঠন ও সাংবাদিকদের মান-মর্যাদা ও অধিকার অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন।
** এমপির ‘নির্দেশনা’ নিয়ে প্রশ্ন –
প্রেসক্লাব মূলত সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠন। ফলে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধি সাংবাদিকদের সংগঠনের কমিটি গঠন বা অনুমোদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলে সেই সংগঠনের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম যেখানে রাষ্ট্র, সরকার, জনপ্রতিনিধি ও ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম, সেখানে সাংবাদিকদের সাংগঠনিক নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ তৈরি হলে তা পেশাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে—লাকসাম প্রেসক্লাবের কমিটি গঠনের এখতিয়ার কি সাংবাদিকদের সংগঠনের সদস্যদের, নাকি স্থানীয় সংসদ সদস্যের?
আর যদি সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেই এমপির কাছে কমিটি গঠন বা অনুমোদনের অনুরোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই উদ্যোগের পেছনে কারা ছিলেন এবং কেন সাংবাদিকরা নিজেরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠন করতে পারলেন না—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে সাংবাদিকদের কেউ এমপির কাছে কমিটি গঠনের অনুরোধ করেছিলেন—এমন দাবির স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য ও সংগঠনের সভার কার্যবিবরণী যাচাই প্রয়োজন।
** এমপির বক্তব্যেও উঠে এসেছে কমিটি দেওয়ার কথা –
এ ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে এমপি মো. আবুল কালামের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিটি গঠনে তাঁর নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি আংশিক কমিটি দিয়েছেন এবং প্রেসক্লাবের প্যাডে কমিটি দিয়েছেন। একজন এমপি হিসেবে প্রেসক্লাবের কমিটি দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজের এলাকা এবং দলের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ, বিষয়টি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো কোনো গুঞ্জন নয়; প্রকাশিত নথি এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট বক্তব্য—দুই দিক থেকেই ঘটনাটির একটি বাস্তব ভিত্তি রয়েছে।
সাংবাদিকদের ‘চাটুকারিতা’ নিয়েও প্রশ্ন
সাংবাদিকদের পেশাগত সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে রাজনৈতিক ব্যক্তির দ্বারস্থ হওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হলে এর দায় শুধু জনপ্রতিনিধির ওপর বর্তায় না—সাংবাদিক সমাজের ভেতর থেকেও প্রশ্ন ওঠে।
কেউ যদি নিজের পেশাগত সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয় নেন, তাহলে সেটি সাংবাদিকদের সাংগঠনিক স্বাধীনতার জন্য কতটা ইতিবাচক এ প্রশ্নের উত্তর সাংবাদিকদেরই দিতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের সরাসরি ‘চাটুকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করার আগে কে বা কারা এমপির কাছে গিয়েছিলেন, কী প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং কী প্রক্রিয়ায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা জরুরি। কারণ ব্যক্তিগত অভিযোগের পরিবর্তে নথি, সাক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতেই সাংবাদিকতার প্রতিবেদন হওয়া উচিত।
স্বাধীন সাংবাদিকতার সঙ্গে সাংগঠনিক স্বাধীনতার সম্পর্ক
সাংবাদিকরা জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন শক্তিশালী পক্ষের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন। এ কারণে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনে পেশাগত স্বচ্ছতা ও সদস্যদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
লাকসামের ক্ষেত্রে নতুন পাঁচ সদস্যের কমিটি কীভাবে গঠিত হলো, প্রেসক্লাবের সদস্যদের কোনো সভা হয়েছিল কি না, ভোট বা মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, পূর্ববর্তী কমিটির অবস্থান কী এবং নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তে কারা ভূমিকা রেখেছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
আগের কমিটির সঙ্গে নতুন কমিটির পার্থক্য
লাকসাম প্রেসক্লাবের আগের কমিটি নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ৩১ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে সভাপতি ছিলেন মশিউর রহমান সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন।
এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত এমপি আবুল কালামকে লাকসাম প্রেসক্লাবের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল শুভেচ্ছা জানিয়েছিল বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সে সময় সাংবাদিকরা তাঁর কাছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণমুখী উন্নয়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রেসক্লাবের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নতুন পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আরও তথ্য জানার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
‘চতুর্থ স্তম্ভের’ স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সাংবাদিকদের দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা এবং জনগণের সামনে তথ্য তুলে ধরা। সেই সাংবাদিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব যদি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির নির্দেশনা বা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সংগঠনটির স্বাধীনতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
তবে একইসঙ্গে এটিও সত্য—কেবল একটি কমিটি গঠনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের পেশাগত সততা বা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এজন্য তাদের কার্যক্রম, সংগঠনের গঠনতন্ত্র, কমিটি গঠনের নিয়ম এবং বাস্তব প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশের সুযোগ
এ বিষয়ে এমপি মো. আবুল কালাম, নবগঠিত কমিটির সভাপতি মুজিবুর রহমান দুলাল, সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সংগঠনের অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কমিটি গঠনের আগে কোনো সাধারণ সভা, সদস্যদের মতামত গ্রহণ বা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না—তা তাদের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার হতে পারে।
একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এমপি আবুল কালামেরও এ বিষয়ে তাঁর অবস্থান বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে নবগঠিত কমিটির নেতাদের কাছে প্রশ্ন—তাঁরা কি নিজেদের সংগঠনের সিদ্ধান্তে কমিটি পেয়েছেন, নাকি এমপির নির্দেশনায়?
প্রশ্নগুলোর উত্তর যত স্পষ্ট হবে, ততই পরিষ্কার হবে লাকসাম প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি আসলে সাংবাদিকদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের ফল, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে গঠিত একটি কমিটি।
সারকথা হলো—সাংবাদিকদের সংগঠনের নেতৃত্ব সাংবাদিকদের মধ্য থেকেই স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হওয়া উচিত কি না, লাকসাম প্রেসক্লাবের ঘটনাটি সেই মৌলিক প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এনেছে।



