ইসলাম ধর্ম

কোরআনে বর্ণিত প্রাচীন সাবা সভ্যতার উত্থান ও পতনের ইতিহাস

ইসলামিক বিচিত্রা ডেস্ক: ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর মাআরিব। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলেই গড়ে উঠেছিল সাবা সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধ জনপদ।কোরআনের ৩৪তম সুরার নামও ‘সাবা’। কোরআনে সাবাবাসীর সমৃদ্ধি, তাদের ওপর আল্লাহর অগণিত নেয়ামত, এরপর অকৃতজ্ঞতা ও নাফরমানির পরিণতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

সাবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত সুলাইমান (আ.)-এর যুগের রানি বিলকিসের স্মৃতিও। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, সাবা ছিল একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক রাষ্ট্র।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১১০০ সাল থেকে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত এ অঞ্চলে সাবা সভ্যতার অস্তিত্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায়। পাহাড়বেষ্টিত মরুপ্রধান ভূখণ্ডে তারা এমন এক উন্নত সেচব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যা তাদের জনপদকে পরিণত করেছিল সবুজ-শ্যামল এক সমৃদ্ধ অঞ্চলে।

মরুভূমির মাঝে পানির মহাব্যবস্থা

সাবার জনপদ ছিল দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকায়। সেখানে নদী-নালা বা স্থায়ী জলপ্রবাহ ছিল না।

ফলে কৃষিকাজ ও জনজীবনের জন্য তাদের প্রধান নির্ভরতা ছিল বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢল। কিন্তু বৃষ্টির পানি কখনো অতিরিক্ত হয়ে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করত, আবার কখনো পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে দেখা দিত তীব্র পানিসংকট। এই সমস্যার সমাধানে সাবাবাসীরা বিস্ময়কর এক সেচব্যবস্থা গড়ে তোলে। ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা বহু বাঁধ নির্মাণ করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল ‘সাদ্দে মাআরিব’—অর্থাৎ মাআরিব বাঁধ।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়, মাআরিব শহরের দক্ষিণে পাহাড় দুটির মাঝখানে অবস্থিত উপত্যকায় এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি ও প্রবল ঢল বাঁধে আটকে রাখা হতো। এরপর বিশেষ জলনিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে সেই পানি সুশৃঙ্খলভাবে কৃষিজমি ও জনপদে পৌঁছে দেওয়া হতো। তাফসিরের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, বাঁধে পানি নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহের জন্য একাধিক প্রবেশপথ বা জলদ্বার ছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো খুলে পানি বিভিন্ন খাল ও জলাধারের মাধ্যমে জনপদের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে দেওয়া হতো। এভাবেই মরুভূমির মধ্যে গড়ে উঠেছিল একটি উন্নত সেচসভ্যতা।

‘ডান ও বাঁ দিকে দুটি উদ্যান’

এই সুব্যবস্থার ফলে সাবার জনপদ হয়ে উঠেছিল সবুজ-শ্যামল ও ফল-ফসলে পরিপূর্ণ। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ছিল বাগান। খেজুরগাছের কাঁদি নুয়ে পড়ত ফলের ভারে। বিভিন্ন ধরনের ফলমূল ও সুগন্ধি বৃক্ষের সমারোহে অঞ্চলটি যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল উদ্যানভূমিতে। কোরআন এই অবিশ্বাস্য সমৃদ্ধির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘সাবার অধিবাসীদের জন্য তাদের বাসভূমিতে ছিল এক নিদর্শন—দুটি উদ্যান, একটি ডান দিকে এবং অপরটি বাম দিকে।’ এরপর তাদের বলা হয়েছিল, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দেওয়া রিজিক ভোগ করো এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। উত্তম নগরী এবং ক্ষমাশীল প্রতিপালক।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১৫)

অর্থাৎ তাদের সমৃদ্ধির মূল রহস্য শুধু বাঁধ, কৃষি ও বাণিজ্য ছিল না; বরং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের স্বীকৃতি ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপদ ও সমৃদ্ধ এক জনপদ

সাবার সমৃদ্ধি শুধু কৃষিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাণিজ্য, যোগাযোগ ও নগরজীবনেও তারা উন্নতি করেছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও তাফসিরি বর্ণনায় তাদের জনপদগুলোর মধ্যে নিরাপদ ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, সাবা থেকে শাম অঞ্চলের দিকে যাওয়ার পথে একের পর এক জনপদ ছিল। যাত্রাপথে মানুষ সহজেই এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে পৌঁছাতে পারত। ফলে দীর্ঘ সফরও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ছিল। কোরআন তাদের এই নেয়ামতের কথাও উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের ও যেসব জনপদের প্রতি আমি অনুগ্রহ বর্ষণ করেছিলাম, সেগুলোর মাঝখানে অনেক দৃশ্যমান জনপদ স্থাপন করেছিলাম এবং সেগুলোর মাঝে সমান সমান দূরত্বে সফর-মনজিল করে দিয়েছিলাম।’ তাদের বলা হয়েছিল, ‘তোমরা এসব জনপদে রাতে ও দিনে নিরাপদে ভ্রমণ করো।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১৮)

এ ছিল এমন এক জীবনব্যবস্থা, যেখানে কৃষি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।

সাবাবাসীর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল তাদের এই বিপুল সমৃদ্ধি। আল্লাহ তাদের রিজিক দিয়েছিলেন, নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, উর্বর ভূমি দিয়েছিলেন এবং পানির অসাধারণ ব্যবস্থা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা এসব নেয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে চলে যায়। কোরআন তাদের এই আচরণকে সংক্ষেপে এভাবে তুলে ধরেছে, ‘কিন্তু তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। ফলে আমি তাদের ওপর প্রেরণ করলাম বাঁধভাঙা বন্যা।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১৬)

এখানেই সাবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। একটি জাতি প্রযুক্তি, কৃষি, অর্থনীতি ও সভ্যতায় যতই উন্নত হোক, আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা তাকে পতনের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

মাআরিব বাঁধের বিপর্যয়

তাফসিরের বিভিন্ন বর্ণনায় মাআরিব বাঁধের বিপর্যয় সম্পর্কে নানা বিবরণ পাওয়া যায়। কিছু বর্ণনায় বাঁধের দুর্বল হয়ে পড়া এবং ইঁদুরের মাধ্যমে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ঐতিহাসিক বর্ণনার সবকটি সমান মাত্রায় নির্ভরযোগ্য নয়। কোরআন মূলত যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে তা হলো—সাবাবাসীর অবাধ্যতার পর তাদের ওপর ‘সাইলুল আরিম’ বা বাঁধভাঙা ভয়াবহ বন্যা নেমে আসে। একসময় সেই বাঁধ ভেঙে যায়। সঞ্চিত বিপুল পানি প্রচণ্ড স্রোতে বেরিয়ে আসে। পথের অন্যান্য বাঁধ ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাআরিব ও আশপাশের জনপদ প্লাবিত হয়ে যায়। যে ভূমি একসময় ছিল ফল-ফসল ও সবুজ বাগানে পরিপূর্ণ, সেখানে নেমে আসে ধ্বংসের ছায়া। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তাদের বাগান দুটিকে পরিবর্তন করে দিলাম এমন দুটি বাগানে, যাতে জন্মিত বিস্বাদ ফল, ঝাউগাছ এবং কিছু কুলগাছ।’ ‘তাদের অকৃতজ্ঞতার কারণে আমি তাদের এ শাস্তি দিয়েছিলাম। আর আমি অকৃতজ্ঞ ছাড়া কাউকে এমন শাস্তি দিই না।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১৬-১৭)

একই ভূমি—একসময় যেখানে ছিল ফলের ভারে নুয়ে পড়া বৃক্ষ, সেখানে পরে জন্ম নিল অনাকর্ষণীয় উদ্ভিদ, ঝাউগাছ ও কুলগাছ। সমৃদ্ধির বাগান পরিণত হলো অনুর্বরতার প্রতীকে। বাঁধভাঙা বন্যার পর সাবার জনপদগুলো আর আগের মতো রইল না। মানুষ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলো। যে জাতি একসময় সুসংগঠিত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জনপদে বসবাস করত, তারা ধীরে ধীরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তাদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১৯)

সাবার কাহিনির সবচেয়ে বড় শিক্ষা

সাবাবাসীর হাতে ছিল জ্ঞান, প্রযুক্তি, সম্পদ, কৃষি, বাণিজ্য ও উন্নত সেচব্যবস্থা। তারা প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো শক্তিশালী অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল। কিন্তু কোনো প্রযুক্তি, কোনো সম্পদ এবং কোনো সভ্যতাই মানুষকে আল্লাহর মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত করতে পারে না। মাআরিব বাঁধ মানুষের প্রকৌশল দক্ষতার অসাধারণ নিদর্শন হতে পারে; কিন্তু কোরআন আমাদের দৃষ্টি আরও গভীরে নিয়ে যায়। আল্লাহ মানুষকে সম্পদ দেন, বুদ্ধি দেন, উপায় দেন—কিন্তু সেই নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়িত্বও মানুষের। সাবার বাগান ছিল, কিন্তু তারা কৃতজ্ঞতা হারিয়েছিল। তাদের নিরাপদ পথ ছিল, কিন্তু তারা নেয়ামতের মূল্য বুঝতে পারেনি। তাদের পানি ছিল, কৃষি ছিল, বাণিজ্য ছিল, সমৃদ্ধি ছিল—কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সভ্যতা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

আধুনিক পৃথিবীও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, নগরায়ণ ও অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। মানুষ নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ করছে, সমুদ্রের ওপর সেতু নির্মাণ করছে, মরুভূমিতে সবুজ নগরী গড়ে তুলছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে মহাকাশ গবেষণা পর্যন্ত বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করছে। কিন্তু সাবার কাহিনি মনে করিয়ে দেয়—উন্নতি যত বড়ই হোক, মানুষ যেন তার স্রষ্টাকে ভুলে না যায়। কারণ নেয়ামতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)

সাবার কাহিনি প্রত্যেক ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। মাআরিবের ধ্বংসাবশেষ যেন আজও সেই কথাই বলে—সভ্যতার শক্তি মানুষকে উন্নত করতে পারে, কিন্তু কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহভীতি ছাড়া সেই উন্নতি স্থায়ী হয় না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button