বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা: বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অ্যাডহক কমিটি গঠনের জন্য সরকারের নির্ধারিত নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু সেই নীতিমালা কি বাস্তবে কার্যকর? নাকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধানের তৈরি তালিকা ও প্রস্তাবনাই হয়ে উঠছে কমিটি গঠনের মূল ভিত্তি? সাতক্ষীরার তালা উপজেলার বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠনকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে এমনই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রস্তুত করা প্রস্তাবের ভিত্তিতেই অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। আর সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোর কমিটির অনুমোদন দিয়েছে বলে দাবি করেছেন বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য এম একরামুল হক আসাদ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকারি নীতিমালা ভঙ্গ করে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত একজনকে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। অভিযোগকারী ওই ব্যক্তিকে ছাত্রদলের নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কাঠামোয় রাজনৈতিক পরিচয় ও সরকারি নীতিমালার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।
বিদ্যালয়ের আজীবন দাতা সদস্য এম একরামুল হক আসাদ জানান, অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি কমিটি গঠনের প্রস্তাব, সদস্য মনোনয়ন এবং সভাপতির যোগ্যতা—সবকিছুই সরকারি নীতিমালার আলোকে যাচাই করার দাবি জানান।কিন্তু তার অভিযোগের নিষ্পত্তি না করেই অ্যাডহক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তার প্রশ্ন—অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই যদি বিতর্কিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়, তাহলে সরকারি নীতিমালা থাকার প্রয়োজনই বা কী?
অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি নীতিমালার পরিবর্তে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের তৈরি করা তালিকা ও প্রস্তাবই অ্যাডহক কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কার্যত অনুসরণ করা হয়েছে। তিনি জানতে চেয়েছেন, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক কি সরকারি নীতিমালার বিকল্প কোনো নিজস্ব নীতিমালা তৈরি করে কমিটি গঠনের ভিত্তি নির্ধারণ করতে পারেন?
এ প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করছে পুরো বিষয়টির প্রশাসনিক বৈধতা—এমনটাই মনে করছেন অভিযোগকারী।
শিক্ষা সচিব ও বোর্ড চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ
বিষয়টি নিয়ে এম একরামুল হক আসাদ শিক্ষা সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, যশোরের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তিনি কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়া তদন্ত, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার অভিযোগ যথাযথভাবে নিষ্পত্তি না হওয়ায় তিনি পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদন করেছেন। সেখানে তিনি বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্নের মুখে যশোর শিক্ষা বোর্ডের ভূমিকা
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে যশোর শিক্ষা বোর্ডের ভূমিকা নিয়েও। যদি অভিযোগকারীর বক্তব্য ও দাখিল করা নথিতে উল্লিখিত তথ্য সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে কমিটির অনুমোদন দেওয়া হলো কীভাবে? কমিটি অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের যোগ্যতা, পরিচয় এবং সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
আর যদি বোর্ডের অনুমোদন সম্পূর্ণ সরকারি নীতিমালা অনুসারেই হয়ে থাকে, তাহলে অভিযোগকারী যে নীতিমালা লঙ্ঘনের কথা বলছেন, তার ভিত্তি কী—সেটিও পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে আসল চিত্র
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি গঠন কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। এটি সরকারি বিধি ও নীতিমালার আওতাভুক্ত একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। ফলে বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠনে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সভাপতির যোগ্যতা ও পরিচয় যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং অভিযোগ দাখিলের পরও কেন কমিটির অনুমোদন দেওয়া হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং যশোর শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারী এম একরামুল হক আসাদ বলেছেন, “আমি কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের বিরুদ্ধে নই; আমি চাই সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটি গঠিত হোক। অভিযোগ করার পরও যদি অভিযোগের নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে প্রশাসনিক জবাবদিহি কোথায়—সেটিই আমার প্রশ্ন।”
এখন দেখার বিষয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে এবং বারাত মনোহরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটি গঠনের নেপথ্যে সরকারি নীতিমালা কতটা অনুসরণ করা হয়েছে—তা প্রকাশ্যে আসে কি না।



