দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা মহাপাপ: পবিত্র কোরআনের শিক্ষা ও তাফসির পর্যালোচনা

ধর্ম ও জীবন ডেস্ক: দারিদ্র্য বা অভাব-অনটনের ভয়ে সন্তান হত্যা করা ইসলামে এক চরম জঘন্য ও নিষিদ্ধ অপরাধ। প্রাক-ইসলামি জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতার যুগে কন্যাসন্তানকে জীবিত কবর দেওয়া কিংবা খাবারের অভাবের ভয়ে সন্তানকে হত্যা করার যে কুপ্রথা প্রচলিত ছিল, পবিত্র কোরআনে কঠোর ভাষায় তার প্রতিবাদ ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সূরা বনি ইসরাইলের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন— “দারিদ্র্যের আশঙ্কায় নিজেদের সন্তান হত্যা করো না। আমি তাদেরকেও রিজিক দেব এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা এক মহাপাপ।”
ইসলামি তাফসিরবিদদের মতে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পিতা-মাতার চেয়েও বান্দার প্রতি অধিক দয়ালু। পবিত্র কোরআনের তাফসির ইবনে কাসিরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষ সাধারণ ধারণাবশে মনে করে সন্তানের রিজিকের সংস্থান তাকেই করতে হবে। অথচ আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—সকল সৃষ্টির জীবনোপকরণ ও রিজিকের দায়িত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে। কোনো মানুষের রিজিক অন্য মানুষের ওপর নির্ভর করে না। পবিত্র সূরা আনআমেও একইভাবে সন্তান হত্যাকে বারণ করে আল্লাহ স্বয়ং রিজিকদাতা হওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
হাদিস শরিফেও এই অপরাধের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি? জবাবে রাসুল (সা.) আল্লাহর সাথে শরিক করাকে সবচেয়ে বড় পাপ হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর দ্বিতীয় বৃহৎ পাপ হিসেবে উল্লেখ করেন—নিজের সন্তান তার সাথে আহার ভাগ করে নেবে, কেবল এই ভয়ে তাকে হত্যা করা।
এদিকে তাফসিরে আহসানুল বায়ানের আলোকে বিশ্লেষকরা আলোকপাত করেছেন যে, আধুনিক যুগে ‘সন্তান লালন-পালনের অতিরিক্ত খরচ’ কিংবা বাহ্যিক সৌন্দর্য বা শারীরিক গঠনের অজুহাতে অন্যায়ভাবে গর্ভপাত বা সন্তান ধ্বংস করার যে প্রবণতা দৃশ্যমান, তা মূলত সেই জাহিলি যুগের কুসংস্কার ও অপরাধেরই এক পরিবর্তিত রূপ। অপত্য স্নেহের বিপরীত গিয়ে আর্থিক সংকটের ভয়ে সন্তানকে জীবন থেকে বঞ্চিত করা একটি অন্যতম কবিরা গুনাহ।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসের এ বাণী মানবজাতিকে এটিই শিক্ষা দেয় যে, প্রতিটি প্রাণের রিজিকের জিম্মাদার সৃষ্টিকর্তা নিজে। তাই কোনো ধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা কাল্পনিক ভীতি থেকে সন্তানকে অংকুরে বিনাশ করা বা হত্যা করা চরমতম অন্যায়।



