ফিচারড

আঞ্চলিক সাংবাদিকতা ও জীবনের ঝুঁকি: সত্য প্রকাশের মূল্য কতটা চড়া?

অনলাইন ডেস্ক: ঢাকার বাইরে বা মফস্বল এলাকায় কর্মরত সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার অভাব নিয়ে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সাংবাদিকতার নানামুখী সংকট, ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে।

‘মফস্বল’ শব্দটির মধ্য দিয়ে রাজধানী কেন্দ্রিক একধরনের মানসিক দূরত্ব বা অবহেলার সুর ফুটিয়ে ওঠে, যা পরিবর্তন করে একে ‘আঞ্চলিক সাংবাদিকতা’ হিসেবে মূল্যায়নের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ, গ্রামের বা উপজেলার একজন মানুষের দুর্ভোগ, দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের খবর কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আঞ্চলিক সাংবাদিকদের নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়:

  • প্রভাবশালীদের চাপ ও হুমকি: স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসী চক্র, ভূমিদস্যু কিংবা দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলেই নেমে আসে বহুমুখী চাপ।
  • শারীরিক হামলা ও প্রাণহানি: লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির কিংবা গাজীপুরের সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের মতো তরুণ ও সাহসী সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রমাণ করে সংবাদ সংগ্রহের কাজটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
  • প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার অভাব: পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে হামলা বা মামলার শিকার হলে অধিকাংশ সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর মতো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি সুরক্ষা থাকে না।

আঞ্চলিক সাংবাদিকতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এর সঙ্গে জড়িত আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিয়মিত বেতন, নিয়োগপত্র, ঝুঁকিভাতা কিংবা চিকিৎসা সহায়তার বিষয়টি নিশ্চিত না করেই সাংবাদিকদের মাঠে নামিয়ে দেয়। নামমাত্র পরিচর্যাপত্র বা মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা অনেক সময় আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম অসহায়ত্বের শিকার হন, যা তাদের পেশাগত সততাকেও প্রশ্নবিচারের মুখে ফেলে দেয়।

নিবন্ধে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেবল সাহসিকতার প্রশংসা করেই দায়িত্ব শেষ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি মহলের জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন:

১. গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের ভূমিকা: আঞ্চলিক সংবাদকর্মীদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি, নিয়মিত ও উপযুক্ত বেতন, ঝুঁকিভাতা, আইনি সহায়তা এবং কোনো বিপদের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব।

২. রাষ্ট্রের ভূমিকা: কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত বা নিহত হলে দ্রুততম সময়ে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব বা পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য।

সাংবাদিকের নিরাপত্তা কেবল কোনো একটি পেশার নিজস্ব সমস্যা নয়; এটি নাগরিকের অবাধে তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আঞ্চলিক সাংবাদিকদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেলে গ্রামীণ জনপদের প্রকৃত চিত্র ও অনিয়মের তথ্য আড়ালে চলে যায়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসনের অন্তরায়। তাই আঞ্চলিক সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং সম্মানজনক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button