ইসলাম ধর্ম

গরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে মক্কার হারামে গায়েবি রিজিক পৌঁছানোর বিস্ময়কর ইতিহাস

ইসলামিক ইতিহাস: আল্লাহ তাআলার ওপর পরিপূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) এবং অদৃশ্য রিজিক বণ্টনের এক চমৎকার ও শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণিত হয়েছে প্রখ্যাত সুফি সাধক ও বুযুর্গ আবু ইয়াকুব আল-আকতা’ আল-বাসরি (রহ.)-এর বর্ণনায়। মানুষের চরম সংকটময় মুহূর্তেও আল্লাহর গায়েবি সাহায্য কীভাবে বান্দার কাছে পৌঁছে যায়, তার এক জীবন্ত প্রমাণ এই ঐতিহাসিক বিবরণটি।

বুযুর্গ আবু ইয়াকুব আল-আকতা’ (রহ.) জানান যে, একবার পবিত্র মক্কার মসজিদে হারামে অবস্থানকালে তিনি টানা ১০ দিন ধরে প্রচণ্ড ক্ষুধায় চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। ক্ষুধার তীব্রতা ও শারীরিক দুর্বলতা যখন সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তিনি খাদ্যের সন্ধানে মক্কার উপত্যকার দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

সেখানে গিয়ে তিনি রাস্তার পাশে একটি ফেলে দেওয়া পচা শালগম দেখতে পান এবং ক্ষুধার তাড়নায় সেটি কুড়িয়ে নেন। কিন্তু হাতেনাতে সেটি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর অন্তরে তীব্র এক সংকোচ ও অনুশোচনা জন্ম নেয়। ভেতর থেকে যেন এক আত্মিক অনুশাসন তাঁকে নাড়া দিয়ে বলে ওঠে— টানা ১০ দিন পরম ধৈর্যের সঙ্গে ক্ষুধা সহ্য করার পর শেষ পর্যন্ত তোমার ভাগ্যে জুটল এই পচা ও নর্দমার ফেলে দেওয়া শালগম?

এই ভাবনায় তিনি তৎক্ষণাৎ শালগমটি ফেলে দেন এবং হতাশ মনে মসজিদে ফিরে এসে শান্ত হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে বসে পড়েন।

মসজিদে ফিরে আসার কিছুক্ষণ পরই এক অচেনা অনারব ব্যক্তি এসে তাঁর সামনে একটি পুঁটলি রেখে বলেন যে এটি তাঁর জন্য। এত মানুষ থাকতে বিশেষভাবে তাঁকে কেন এই খাবার দেওয়া হচ্ছে—জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন:

“জেনে রাখুন! আজ থেকে ঠিক ১০ দিন আগে আমরা সাগরে নৌকায় সফর করছিলাম। হঠাৎ আমাদের নৌকা ডুবতে শুরু করে এবং আমরা মৃত্যুর মুখোমুখি হই। তখন আমি আল্লাহর দরবারে মানত করেছিলাম, আল্লাহ যদি আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করেন, তবে মক্কার হারামে পৌঁছার পর প্রথম যে ব্যক্তির ওপর আমার নজর পড়বে, তাকেই আমি এই খাবারগুলো সদকা করে দেব। আর এখানে আসার পর আপনিই সেই প্রথম ব্যক্তি, যার ওপর আমার প্রথম নজর পড়েছে!”

ওই ব্যক্তির কথা শুনে আবু ইয়াকুব আল-আকতা’ (রহ.) তাঁকে পুঁটলি খুলতে বলেন। খোলার পর দেখা যায়, ভেতরে রয়েছে মিশরের অত্যন্ত সুস্বাদু সুজি, খোসা ছাড়ানো কাঠবাদাম এবং দামি মিছরি। তিনি সেখান থেকে অল্প কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে বাকিটা ওই ব্যক্তির পরিবার ও সঙ্গীদের জন্য উপহার হিসেবে ফিরিয়ে দেন এবং অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর হাদিয়া কবুল করেন।

লোকটি চলে যাওয়ার পর সেই বুযুর্গ বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইলেন এবং নিজের অন্তরের সঙ্গে কথা বলে উঠলেন:

“আবু ইয়াকুব! তোমার রিজিক গত ১০ দিন ধরে সাগরের উত্তাল বুক চিরে তোমার দিকেই ছুটে আসছিল, আর তুমি কি না হতাশ হয়ে উপত্যকায় পচা শালগম খুঁজছিলে!”

এই ঘটনাটি মানবজাতির জন্য এক বিরাট আত্মিক শিক্ষা বহন করে। রিজিকের একমাত্র মালিক হলেন মহান আল্লাহ তাআলা। মানুষ যখন চরম বিপদে পড়ে, পারিপার্শ্বিক সব উপায় বন্ধ হয়ে যায় এবং দুনিয়ার সমস্ত দরজা রুদ্ধ মনে হয়, তখনো অলক্ষ্য থেকে রবের গায়েবি ফয়সালা ও রিজিকের চাকা সচল থাকে।

অভাবের তাড়নায় অধৈর্য না হয়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা প্রতিটি মুমিনের কর্তব্য। কারণ পৃথিবীর কোনো শক্তিই সেই রিজিক আটকে রাখতে পারে না, যা মহান আল্লাহ বান্দার ভাগ্যে নির্ধারণ করে রেখেছেন।

(তথ্যসূত্র: আর রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ / সংকলক: সালমান ফার্সি)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button